29 Oct 2017   03:57:09 AM   Sunday   BdST

হায় রে সর্বনাশা নেশা!

গোপাল দত্ত: আদিকাল থেকে আদিকাল থেকে অর্থাৎ পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে মানুষ কোনো না কোনোভাবে নেশার দ্রব্য গ্রহণ করতেন।


কেউ আবার ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে, জাতিগতভাবে, গোষ্ঠীগতভাবে, আবার কেউ রাষ্ট্রীয়ভাবে নেশার ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলেন।


নেশা তখন নিজের স্বার্থ বা অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য- কখনও ছিল খুনের নেশা, রাজ্য জয়ের নেশা, দেশ জয়ের নেশা।


দেশ জয়ের নেশায় পড়ে মানুষ তার নিজের মাতৃভূমি থেকে এত দূরে এগিয়ে গিয়েছিল যে, সাম্রাজ্যের মালিক হওয়ার জন্য সে ভুলে গিয়েছিল মৃত্যু তার জন্য অবধারিতভাবে অপেক্ষা করছে প্রাকৃতিক নিয়মে অথবা কোনো দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধে শুধু ভূখণ্ড দখলের জন্য, নিজের ক্ষমতা প্রমাণের জন্য যে ধরনের অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে সেই অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে শত্রুকে নিধন করার জন্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতের সংখ্যার চেয়ে, যুদ্ধোত্তর সময় যুদ্ধে লিপ্ত দেশগুলোর বহুসংখ্যক মৃত্যুর জন্য প্রধানত দায়ী ছিল ইনফেকশন অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের জন্য অনেক লোককে জীবন দিতে হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে।


ধন্যবাদ আলেক্সান্ডার ফ্লেমিংকে যিনি ১৯৩৮ সালের দিকে পেনিসিলিন আবিষ্কার করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংক্রমণের জন্য মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কমিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে পরিমাণ বিষাক্ত ও বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, যে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে (যেমন আণবিক বোমা) তাতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ইউরোপীয় জাতিগুলো, জার্মান ও ব্রিটিশরা, একে অপরকে হত্যার জন্য কতই না উদগ্রীব ছিল, যা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। শুধু নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য। ইতিহাস সেখানে সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


বর্তমানে যুদ্ধের নেশা, মাদক আসক্তির নেশা মানবজাতি ও সভ্যতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। মানব সভ্যতাকে আদিকাল থেকে স্রষ্টা সর্বোচ্চ শিখরে স্থাপন করেছেন। স্রষ্টা মানুষকে তার শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু বিজ্ঞানের অসম্ভব উন্নতির পরও সভ্যতা ধ্বংসের দিকেই ধাবিত হতে চলেছে। সেই নেশা মাদকাসক্তির নেশা। যে নেশা আজকে পুরো বিশ্বকে বিনা যুদ্ধে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গিয়েছে এবং মানুষের মানবিক মূল্যবোধকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে।


সামান্য কিছু অর্থপিপাসু, মাদকসম্রাট লোকের জন্য আজকের এই তরুণ সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, নৈতিক চরিত্র হারিয়ে ফেলছে, এমনকি সমাজ বিনির্মাণে তাদের ভূমিকা শুধু যে তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে তা-ই নয়, নিজ পরিবারের ধ্বংসের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তারা। মাদকাসক্ত ছেলে, মাদক আসক্তির পয়সা জোগাড় করতে না পেরে মাকে, বাবাকে অথবা একই সঙ্গে মা-বাবা, ভাই-বোনকে খুন করছে। যেখানে তাদের দায়িত্ব ছিল জনগণের মূল্যায়ন করা, তাদের পরিবারকে শক্তিশালী করা।


আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এত বড় বড় মাদক সম্রাটের জন্ম হয়েছে যে, মাদকাসক্তি নিরাময় তো দূরের কথা, আমেরিকার মতো দেশের অনেক রাজ্যে মাদকরাজা মারিজুয়ানা অর্থাৎ গাঁজাকে আইনগতভাবে সিদ্ধ করা হয়েছে। যে গাঁজা পানে মানুষ শুধু মাদকাসক্তই হয় না, দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশও সৃষ্টি করে।


বলিভিয়া, পেরু, মেক্সিকোর মতো দেশের মাদক সম্রাটদের ক্ষমতা, চরিত্র বা ধনসম্পদের গল্প অনেক রাজা-মহারাজাকেও হার মানায়। আমাদের দেশে এ ধরনের মাদকসম্রাট নেই বলা ভুল হবে, হয়তোবা সাধারণ মানুষের কাছে তারা নিজেকে সম্রাট বা সাম্রাজ্যের মালিক হিসেবে পরিচয় দিতে কিছুটা সংকোচ বা লজ্জাবোধ করেন। তবে মাদকসম্রাটদের পরিচয় না জানলেও ছোটখাটো লাখ লাখ মাদক বিক্রেতার এবং মাদক গ্রহীতার খবর আমরা জানি। যারা জীবিকার জন্য তা করে থাকেন এবং যারা জানে না কে মাদকসম্রাট।


১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ থিম্পু রয়েল কলেজের প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে ‘A disease called drugs’শিরোনামে একটি বক্তব্য দেয়ার জন্য ৯০০ মেধাবী তরুণ-তরুণীর সামনে হাজির হয়েছিলাম। এক ঘণ্টার বেশি সময়ের এই বক্তব্যে ছাত্রছাত্রীদের পিনপতন নিস্তব্ধতা আমাকে বিমোহিত করেছিল। তাদের প্রশ্ন আমার মনে অনেক চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে, এখনও আমি তাদের প্রশ্নের সমাধান খুঁজে বেড়াই।


মাদক কী করে বা কেন মানুষ গ্রহণ করে :

ক) সাময়িকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করে, ব্রেইনের গতি বৃদ্ধি করে নিকোটিন, এমফিটামিন, কোকেইন।

খ) ডিপ্রেসেন্ট বা মস্তিষ্ককে নিস্তেজ করে বা স্লো ডাউন করে।

গ) Hallucination (LSD, Magic Mushroom, Marijuana), যা স্বপ্ন দেখায়।

অর্থাৎ উল্লেখিত তিন কারণই মানুষকে মাদকে প্রলুব্ধ করে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা তাদের ভালো বন্ধু বা সহপাঠীদের আসক্তিতে প্রলুব্ধ করে।


আমাদের সমাজব্যবস্থায় যখন আমরা দেখি আমার বন্ধুর ছেলে মাদকাসক্ত অথবা কোনো সরকারি কলোনিতে কখনও যখন দু-একটি ছেলে মাদকের দিকে আসক্ত হয়, তখন আমরা ওই পরিবারকে এড়িয়ে চলি। অথচ হওয়া উচিত ছিল উল্টোটা। কলোনির সবাই মিলে ওই পরিবারকে সাহায্য করা, ওই ছেলেটাকে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে বা চিকিৎসা দিয়ে যে কোনোভাবেই হোক নিরাময় করে তুলতে সাহায্য করা।


আমরা জানি আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকা অবস্থায় মাদকাসক্ত হয়ে গেলে তার দাদি তাকে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করে সুস্থ করে তোলেন। পরে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে অল্প বয়সে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন দু’বার।


মাদকাসক্তের সংখ্যা কমাতে বা নির্মূল করতে হলে আমাদের অবশ্যই মাদক আমদানির রাস্তা বন্ধ করতে হবে। সরকারকে রাস্তাগুলো চিহ্নিত করে সে রাস্তা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। খুচরা বিক্রেতাদের সমাজে পুনর্বাসন করতে হবে, আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিয়ে নিরাসক্ত করে তুলতে হবে। শুধু নিরাসক্ত নয়, তাদেরকে সমাজ উন্নয়নে অংশীদার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, তারা কিন্তু অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে, কাজ করতে পারে এবং সমস্যার দ্রুত সমাধান দিতে পারে। মাদকের সর্বনাশা গ্রাস থেকে দেশ তথা পৃথিবীকে বাঁচাতে ও বাসযোগ্য করতে হবে।


মাদকের সর্বনাশা গ্রাস থেকে এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছি আমরা। আমাদেরই হওয়া উচিত শেষ প্রজন্ম, যাদের কাঁধে পৃথিবীকে বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।


অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক; সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক; সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়