04 May 2017   10:40:56 PM   Thursday   BdST

বিয়ের বাজারে গণমাধ্যমকর্মীর মূল্য দপ্তরির চেয়েও কম

নিউজবুক ডেস্ক॥ ‘বিয়ের বাজারে একজন গণমাধ্যমকর্মীর চেয়ে ছুটির ঘণ্টা বাজানো দপ্তরির মূল্যও বেশি!’ আজ ৩ মে। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে। অর্থাৎ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। সোজাভাবে দেখলে হয়তো বছরের বাকি দিবসগুলোর মতোই সাধারণ একটি দিবস, একটু বাঁকাভাবে দেখলে বিশ্বের বিশেষায়িত দিবসগুলোর মধ্যে মোটাদাগে ব্যতিক্রমী একটি বিষয়।

 

এই ‘একটু বাঁকাভাবে’ দেখার কাজটি যারা অক্লান্তভাবে করে চলেন প্রতিনিয়ত, তাদের কর্ম-ক্ষেত্র-উদ্দীপনার জন্যই দিনটি বিশেষায়িত। যাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ- গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মী।

 

প্রতিবছরের মতো বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘ক্রান্তিকালে সমালোচকের দৃষ্টি: শান্তিপূর্ণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা।’

 

প্রতিপাদ্যের বিষয়বস্তুর আলোকপাত করা অংশটি গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে। এনিয়ে হয়তো বিস্তর গালভরা বক্তৃতা আওড়ে যাবেন গুণীজনেরা। সেটির দরকারও আছে। কিন্তু গণমাধ্যমের এই ভূমিকা নিশ্চিতকরণে যাদের অক্লান্ত নিবেদন, সেই গণমাধ্যমকর্মীদের বিষয়টি যেন অনেকটা অনুল্লেখিতই থেকে যাচ্ছে সবসময়। প্রতিপাদ্যের বিষয়বস্তু নির্বাচনে বা নিরিখ আলোচনায়। কিঞ্চিত যেটি আলোচনায় আসছে, সেটি তাদের কর্মপরিধি বা পন্থা নিয়ে; কর্মপরিবেশ বা যাপিত জীবনের অংশটি গৌণই থেকে যাচ্ছে।

 

অথচ গণমাধ্যমের ভূমিকার সঙ্গে সামগ্রিকভাবেই উচ্চারিত হওয়ার কথা ছিল গণমাধ্যমকর্মীদের যাপিত জীবনের অংশটির কথাটিও। দুটোতো একে অপরের পরিপূরক। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমকর্মীদের যাপিত এই অংশের ভূমিকা নিশ্চিত না হলে মুক্ত গণমাধ্যমের ভূমিকাও কখনও ‘নিশ্চিতপুরে’র ঠিকানা খুঁজে পাবে না।

 

এদেশে গণমাধ্যমকর্মীরা বাইরে দাপট দেখালেও ভেতরে ভেজা মুরগির মতন চুপসে থাকেন। চরম অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার হন। সার্বক্ষণিক অনিরাপত্তায় ডুবে থাকেন। জেল-জুলুম-প্রাণ হারানোর ঘটনার শিকার হন অহরহ। আর্থিক অনটন নিত্যসঙ্গী। এরপরও গণমাধ্যম প্রসঙ্গে উচ্চারিত কথাগুলোর মাঝে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রসঙ্গটিই সবচেয়ে ম্রিয়মাণ। আদতে এই অংশটির সঠিক পরিচর্যা না করে অন্য অনুষঙ্গটির ফলন আশা করা যুক্তিযুক্ত নয়।

 

উপরে সাহসী ভূমিকা রেখে ভেতরে ভেতরে গণমাধ্যমকর্মীদের এহেন জীবনযাপনের পেছনের কারণগুলোও খুব দৃষ্টিঅগোচরের নয়। একটু চোখ মেললেই দেখা যাবে দেশের গণমাধ্যমের একটা বড় অংশ চলছে- দলবাজি-দালালি, কপি-পেস্ট, গাজাখুরি লিখে গোপনসূত্র বা সোর্স বলে চালিয়ে দেওয়া, ব্যক্তি আক্রমণ বা স্বার্থে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে। এই মাধ্যমকে ব্যবহার করে স্বেচ্ছাচারিতার সর্বোচ্চ চর্চাটা দিনকে দিন বাড়ছে। সেটি নিশ্চিতভাবেই গণমাধ্যমের বা এর কর্মীদের মুক্ত পরিবেশের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

 

তার উপর শাসকশ্রেণির তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নামক এক ফণীমনসা তো জেঁকে বসেছেই। যা অপরাধীর চেয়ে স্বাধীনচেতার ওপর খড়গ নামাতেই সদাব্যস্ত। মুক্ত গণমাধ্যম বা স্বাধীন সাংবাদিকতার চর্চায়ও যেটি নতুন একটি প্রতিবন্ধকতার কালোমেঘ হয়ে নেমে এসেছে।

 

তথাপি গণমাধ্যম বা এর কর্মীরা কিন্তু থেমে নেই। নিজেদের জায়গা থেকে ভূমিকা রাখার চর্চা-চেষ্টাটা জারি রেখেছেন। নানা প্রতিবন্ধকতার পরও এই গণমাধ্যমই অনেক গুণীজন প্রসব করেছে বা গুণীজনের প্রসব বেদনা নিরসনে সচেষ্ট থেকেছে, সর্বসাধারণের দুয়ারে যথার্থকথাটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এমনকি সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র যা পারেনি বা করেনি, গণমাধ্যম সেটিও করিয়ে ছেড়েছে!

 

যেখানে আইন-আদালত-মানবতা পৌঁছায়নি বা দেরিতে পৌঁছেছে, সেখানে অনেক আগেই পৌঁছে গেছে গণমাধ্যম। শোষিতের মাথায় বটবৃক্ষের ছায়া হয়েছে। বলেছে অধিকারের কথা। এমন আরো না বলা অনেক ভালো দিকও আছে মাধ্যমটির। আবার উপরে বলা কথাগুলোর বিপরীত চিত্রও বহাল আছে সমানভাবে।

 

গণমাধ্যম কতটা মুক্ত দিনশেষে সেটা নিয়ে বিস্তর বিতর্কের জায়গা তো আছেই। তবে মুক্ত হবার ও অবরুদ্ধ করে রাখবার এই দুপিঠ সঙ্গী হয়ে চলবে অনাদিকাল, যতদিন গণমাধ্যম শব্দটি বেঁচে থাকবে। প্রাণ থাকলে যেমন হারাবার ভয়টা চীরকালীন! প্রাণ হারাবার ভয়ে তো আর ঘরে বসে থাকবার নয়। গণমাধ্যম তাই বসেই নেই। মুক্ত হবার ডাকহরকরে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

 

তবে মুক্ত গণমাধ্যম নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে যেমন গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনতা ও যাপিত জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদেরও বিশ্বাস করতে হবে তারা মুক্ত হতে সদাসচেষ্ট। সবার আগে তাদের বিশ্বাস করাটাই জরুরী। যদি গণমাধ্যমকর্মীরা নিজে বিশ্বাস করেন তারা মুক্তির জন্য নিষ্ঠাবান, তবে বিশ্বাসের রেণুটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

 

নয়তো বিষয়টা পাড়ার চা-চক্রের রসালো আলোচনা বিষয়বস্তুর মতই থেকে যাবে আরো অনেক কাল। আলোচনায় অনেকের মুখেই যেমন শোনা যায়, বিয়ের বাজারে একজন গণমাধ্যম কর্মীর চেয়ে ‘ছুটির ঘণ্টা বাজানো দপ্তরির’ মূল্যও বেশি! সেই মূল্যটা বাড়াতে হলে গণমাধ্যমকর্মীদের যাপিত জীবনকেই সবার আগে উচ্চমূল্যে তুলে নিতে হবে, তখন তারা উচ্চমূল্যে তুলে ধরবেন তাদের বিশ্বাসকে, সেই বিশ্বাস-মূল্য উচ্চতা বাড়িয়ে যাবে গণমাধ্যমের। যে উচ্চতার কাছে আস্তাকুঁড়ে নির্বাসিত হবে সকল প্রতিবন্ধকতা।

 

গণমাধ্যম ও এর কর্মীদের পথচলাটি হয়তো অনিশ্চিত আর ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ঝুঁকিটা তো কাউকে না কাউকে নিতেই হতো। সবকিছুর পর তাই, একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে নিজেকে সাধুবাদ জানাই, সাধুবাদ জানাই পেশাটাকে জীবনের অংশ করে নেওয়ার সাহস করা সকল গণমাধ্যমকর্মীকে। গণমাধ্যমকে সমুন্নত রাখায় যাদের অশেষ অবদান, সর্বশ্রেণীর তাদেরকেও শুভেচ্ছা-সাধুবাদ।