21 Apr 2019   02:28:48 PM   Sunday   BdST

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মান ভারতের চেয়ে এগিয়ে, তাহলে কেন ভারতে চিকিৎসা করতে যান

ইহতিশাম আহমদ টিংকু:  আর্ন্তজাতিক সমীক্ষায় বলছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মান ভারতের চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে, তারপরও কেন এই দেশের দালালেরা ভারতে চিকিৎসা করতে যায়- এই নিয়ে ধন্ধুমার লড়াই চলছে। এবং অভিয়াসলি ব্যক্তিগত আক্রমণসহ কে কোন দলের চামচা সেটাও র্নিধারণ করা হচ্ছে। আমরা আর কিছু না হোক র্তকাতর্কিকে যে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছি এতে কোন সন্দেহ নাই।

 

আমি ডাক্তার না। স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞও নই। তবে নিয়মিত টক শো দেখার অভ্যাস রয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটা টকশোতে বেশ কয়েকজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞর বক্তব্য ও বিশ্লেষণ শুনে যা বুঝেছি তাই বলার চেষ্টা করছি। সেই সাথে ধরে নিচ্ছি যারা এই বিষয়টা নিয়ে তথ্য উপাত্ত এবং যুক্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে কোমর বেঁধে তর্ক করছেন তাদের বাসায় হয় টিভি বা ইন্টারনেট নেই। অথবা থাকলেও তারা তা দেখেন না।
.

একটি দেশের স্বাস্থ্যখাতে মোট তিনটা ভাগ রয়েছে।

 

একটি সচেতনতামূলক- যেমন টয়লেট থেকে বেরিয়ে ঠিক মত হাত ধুবেন। যেখানে সেখানে হাগু মুতু করবেন না। রুই মাছ খেতে পারছেন না বলে কষ্ট পাবেন না। কারণ মলা আর ঠেলা মাছেই বেশী ভিটামিন এ রয়েছে। শাক পাতা গরীবের খাওয়ার নয়, সেটাতেই বরং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশী ইত্যাদি ইত্যাদি। বলা যেতে পারে মিনা কার্টুনে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যা যা শেখানো হয়, সেগুলোর বাস্তবায়ন।

 

এই সেক্টরে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে বেশ অনেকখানি এগিয়ে আছে। অন্ততঃ বাংলাদেশের সব জায়গাতেই যেভাবে টয়লেটের ব্যবহার রয়েছে, ভারতে তা যে নেই এটা ভারতের টিভিগুলোতে বর্তমানে যে প্রচারণা চলছে তা দেখেই বোঝা যায়। ও! আপনারা তো আবার টিভি দেখেন না। তাহলে অক্ষয় কুমারের টয়লেট এক প্রেমকথা সিনেমাটা দেখে নিতে পারেন। চমৎকার সিনেমা।

 

আরেকটি হচ্ছে রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এখানেও বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে বেশ অনেকখানি এগিয়ে। আমাদের দেশে সম্ভবতঃ একজন মানুষও নেই যে, গর্ভবতি অবস্থায় ছয়টি টিকা প্রদানের কথা এবং পাঁচ বছর বয়স পযর্ন্ত নিজের শিশুকে প্রতি বছর পোলিও ড্রপ ও ভিটামিন এ খাওয়ানোর কথা জানেন না এবং সময় মত এই কাজ গুলো করেন না।

 

দেশেকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে কয়েক দশক লেগেছে বলেই আমার ধারণা। স্কুল লাইফ থেকেই তো দেখছি এই টিকা আর পোলিও খাওয়ানোর ক্যাম্পেইন। এমন কি দেশে যেদিন পোলিও খাওয়ানো হয় সেদিন স্বাস্থ্য কর্মীদের আন্তঃজেলা বাসে উঠেও জিজ্ঞেস করতে দেখেছি যে, সেই বাসে ৫ বছরের নিচে কোন শিশু আছে কিনা যে এখনও পোলিও ড্রপ খায়নি। আমি দিনাজপুর থেকে ঢাকা আসার পথে পোলিও খাওয়ানোর দিনটিতে সারাদিনে কয়েকবারই ঘটনাটা ঘটতে দেখেছি। বিষয়টাকে যখন রাষ্ট্র (যেহেতু সব সরকারের আমলেই এটা ঘটেছে তাই রাস্ট্র বলছি) এতটা সিরিয়াসলি দেখেছে এবং দেখছে, তো বুঝতেই পারছেন এই বিষয়ে আমরা কতটা এগিয়ে আছি।

 

এবার আসেন সব শেষ বিষয়টিতে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা দিয়ে মানুষকে সুস্থ করা। একটি টকশোতে দেখলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা পর্যন্ত এক কথায় স্বীকার করলেন যে এই একটি খাতে সরকার এখনও পিছিয়ে আছি। অন্য দুটো খাতের সফলতার পরে সরকার বর্তমানে এই বিষয়ে উন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি আশা করছেন এখাতেও সরকার দ্রুত সফল হবে। সেই সাথে উপদেষ্টা আরো বললেন, মূলতঃ স্বাস্থ্যসেবা বলতে আমরা এই খাতটাকেই বুঝি, তাই বাকি দুটো খাতের উন্নতি আমাদের চোখে পড়ে না।

 

তো, আমাদের এই এই পিছিয়ে পড়া খাতেই ভারতের বেশ কিছু প্রদেশ আমাদের থেকে অনেকখানি এগিয়ে। আর সেখানেই আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার মারফতিটা লুকিয়ে আছে। তবে এখানেও তিনটি স্তর রয়েছে। তার মধ্যে প্রথম দুটি স্তরে নাকি আমরা ভারতের চেয়েও এগিয়ে। অন্ততঃ আর্ন্তজাতিক সমীক্ষার ইনডেক্সগুলো তাই বলছে।

 

একটি রাস্ট্রে স্বাস্থ্য সেবা তিনটি স্তরে প্রদান করা হয়। প্রাইমারী, সেকেন্ডারী ও টারশিয়ারি। বলা হচ্ছে প্রাইমারী লেভেলে চিকিৎসা সেবায় আমরা নাকি সফল। দেশের সব জায়গায় এখন কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সেখানে প্যারামেডিক রয়েছে। সেই সাথে শহরের সরকারী হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজগুলোর সাথে সর্বক্ষনিক যোগাযোগের সুব্যবস্থাও রয়েছে। আমি গ্রামে থাকি না। তাই এটার সত্যতা যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব না। হয়ত আপনাদের মাঝে কেউ এই নিয়ে বলতে পারবেন।

 

সেকেন্ডারী লেবেলে যা রয়েছে তা আমি নিজের চোখেই দেখতে পাই। এককালের পিজি, বর্তমানের বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন কি পরিমান লোক চিকিৎসা নিতে আসে তা এক কানা ছাড়া বাকি সবারই চোখে পড়ার কথা। সেই টক শোতে এক বিশেষজ্ঞ বললেন, বাংলাদেশের সরকারী হাসপাতাল থেকে রোগি নিয়ে গিয়ে ভারতের কোন সরকারী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এমন ঘটনা আজ পর্যন্ত ঘটে নাই।

 

অর্থাৎ আমরা এখানে ওদের চেয়ে এগিয়ে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের সরকারী হাসপাতালে জায়গা না হওয়ার পরও কখনও কোন রোগীকে ফিরিয়ে দেয়া হয় না। স্থান ও ডাক্তার/নার্স ইত্যাদির অভাব থাকার পরও সেকেন্ডারী লেভেলে চিকিৎসা সেবা দারুণ ভাবে সচল। যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলোকে সমাধানের জোর পদেক্ষপও নাকি নেয়া হচ্ছে। অপর দিকে ভারতে সেকেন্ডারী লেভেলে জোর পদক্ষেপ নিলেও তার সমাধান অল্প সময়ের মধ্যে হওয়া সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। কারণ তাদের দেশটা অনেক বড়। সেই সাথে অনেক অঞ্চলে ধর্মীয় কিছু কু-সংস্কারও রয়েছে তীব্র ভাবে।

 

এবার আসেন ঠিক যে কারণে আমরা ভারতে যাই। টারশিয়ারি লেভেলে আমাদের অবস্থা ভীষণ খারাপ। দেশে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের বেশ অভাব রয়েছে। পরিস্কার হাসপাতালের অভাব রয়েছে। একটি হাসপাতালে নার্সসহ নানাবিধ টেকনিশিয়ান ও ব্যবস্থাপকের প্রয়োজন হয়, যার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। তবে সরকার শুনছি এই খাতকে উন্নত করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। বিভিন্ন পর্যায়ের বিশ্বমানের বিশেষায়িত ইউনিট (বার্ন ইউনিট, কার্ডিয়াক ইউনিট ইত্যাদি) প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

 

আমি বারবার শুনেছি অথবা নাকি শব্দটা ব্যবহার করছি, কারণ সরকার যা-ই বলুক তাতে আসলে পরিস্থিতি পাল্টায় না। যখন দেশের জনগণ বলবে তখনই আসলে পরিস্থিতি পাল্টাবে। অবশ্য জনাব ওবায়দুল কাদের-এর সাম্প্রতিক সফল চিকিৎসা এবং দেবী শেঠীর মন্তব্য আমাদেরকে অনেকটাই আশাবাদী করে।

 

টক শোতে শোনা এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের একটি মন্তব্য দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। তিনি বলেছিলেন, যেদিন আমাদের হাসপাতালগুলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হবে এবং ডাক্তাররা ১০/১৫ মিনিটের জায়গায় আধা ঘন্টা করে রোগীকে সময় দিতে পারবে (মানে ডাক্তারের সংখ্যা পর্যাপ্ত হবে) সেদিন আমাদের দেশের রোগীরা আর ভারতে যাবে না।

 

আগের বলেছি আমি ডাক্তার নই। আমার এই লেখায় কোন তথ্যগত ভুল থাকলে ধরিয়ে দেয়ার বিনিত অনুরোধ রইল।