15 Jul 2018   03:25:14 AM   Sunday   BdST

ফেসবুক কখনো সংবাদের প্রধান উৎস হতে পারে না?

 
তানভীর হাসান তানু : নতুন জন্ম নেয়া শিশুটার গায়ের রং কিছুটা কালো। কেউ কেউ কাকের মতো কালো বলছেন। মুখে মুখে ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত শিশুটির মা একটি কাক জন্ম দিয়েছেন বলে প্রচার হতে থাকলো। গল্পটা আমরা অনেকেই জানি।
 
বিকল্প গণমাধ্যম নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সাংবাদিকতায় পড়ার সময় যতদুর জেনেছিলাম, এটা মূলধারার গণমাধ্যমের বাইরে এমন কিছু যার ধরন, প্রোডাকশন, কনটেন্ট, প্রচারণা সব কিছু ভিন্ন। তবে এটা যেহেতু নির্দিষ্ট কোন কাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠে না, তাই এর জবাবদিহিতা এবং বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে প্রায় সময়। এখানেই মূলধারার সঙ্গে পার্থক্য।
 
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এ বিকল্প ধারাটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর কারণ হিসেবে মূলধারার ব্যর্থতা বড় । 
 
কারণ, নিজেদের স্বার্থ, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থ, ব্যবসায়ীক স্বার্থ, বিজ্ঞাপনদাতাদের স্বার্থ, করপোরেট স্বার্থ- এত এত স্বার্থ দেখতে গিয়ে পাঠকের স্বার্থের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এছাড়া দক্ষ সংবাদ কর্মী, কম বিনিয়েগে বেশী লাভ এবং সর্বোপরি পেশাদারিত্বের অভাবের বিষয়টিতো রয়েছেই।
আর এ শূন্যস্থানে বাজিমাত করছে ফেসবুকের মতো বিকল্প গণমাধ্যমগুলো।
 
নোয়াখালির মিলনকে গণপিটুনিতে মেরে ফেলা, সিলেটের খাদিজাকে কুপিয়ে আহত করার ভিডিও, নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যাকাণ্ড, কুমিল্লায় তনু হত্যা, সব কিছুতে মূল গণমাধ্যমের চেয়ে কয়েকগুন বেশি আলোচনায় ছিলো ফেসবুক।
 
সাম্প্রতিককালের সবচে বড়ো গণজমায়েত গণজাগরনমঞ্চের আবির্ভাব হয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে।
 
 কোটা সংষ্কারের নামে যে আন্দোলনটি চলছে, রাজপথে কর্মসূচি পালন হচ্ছে, সেটিও ফেসবুকের একটি গ্রুপের মাধ্যমে। মূল গণমাধ্যমে খুব একটা পাত্তা না পেলেও এ গ্রুপটির সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার। প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সাংবাদিকদের নিউজ সোর্সও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ ফেসবুকই। তার মানে অনেক ক্ষেত্রেই মূল গনমাধ্যমের এজেণ্ডা এখন ঠিক করে দিচ্ছেে ফেসবুক। অনেকটা শক্তিশালী এখন ফেসবুক।
 
এখন রক্ত চেয়ে, বাসা বদলের বিজ্ঞাপন, পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থি চেয়ে বিজ্ঞাপন – সব খানেই পত্রিকা, টিভির চেয়ে আধিপত্য ফেসবুকের।
 
কিন্তু ঐ যে পাতিলের চেয়ে ঢাকনা গরম হলে যেটা হয়, সেটাই ঘটতে শুরু করেছে। ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে মূলধারাকে। বিপদটা সেখানেই। আগে ফেসবুকে ছড়ানো গুজব, খবর ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা অনলাইন মিডিয়া সার্কুলার করতো। এখন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, টিভি চ্যানেলগুলোও তা করতে শুরু করেছে, কোন রকম যাছাই বাছাই ছাড়াই। বিপদটা এখানেই।
 
নূন্যতম নিউজ সেন্স থাকলে বিসিএস কর্মকর্তা তার ম্যাজিস্ট্রেট বউয়ের পরামর্শে মাকে রেল স্টেশনে ফেলে গেছেন, এ নিউজ আমরা করতে পারি না। কারণ, পুরো বিষয়টা ভুয়া এটা বুঝতে অনেক জ্ঞানী হতে হয় না।
 
 প্লাটফর্মটা দেখলেই বুঝা যায়। কোথায়, কোন স্টেশনে, কবে এমন ঘটনা ঘটেছে, স্ট্যাটাসে সেটা উল্লেখ নেই। কোন বৃদ্ধাশ্রমে মাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেটার নাম নেই। কোন ক্লু না রাখতে নাটকের অংশ হিসেবে মাকে মেরে ফেলা হয়েছে, সেটাও সংবাদকর্মীদের নজর এড়িয়ে গেছে। ব্যারিস্টার পরিচয়ধারী যে ভদ্রলোকের আইডি থেকে স্ট্যাটাসটি দেয়া হয়েছে, সেটি ভুয়া কিনা যাছাই করা যেতো। তার মোবাইল নাম্বার না পাওয়া গেলেও মেসেঞ্জারে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা যেতো। ঘটনা যেহেতু অনেক দিন আগের, তার কাছে আপডেট তথ্য চাওয়া যেতো। তার কিছুই কি করা হয়েছে? যেটি করা হয়েছে, তা হলো- তাড়াহুড়ো করে এটাকে নিউজ বানিয়ে ছাপানোর প্রতিযোগিতা। আর ভুলটা ঘটেছে তাতেই।
প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে সাংবাদিকতাকে।
 
ফেসবুক কখনো সংবাদের প্রধান উৎস হতে পারে না, বড়োজোর একটি সূত্র হতে পারে। ফেসবুক প্রতিদ্বন্দিও নয়, সহায়ক মাধ্যম। তবে এটাকে সংবাদ হিসেবে রান্না করে পাঠকের পাতে তুলে দিতে আরো অনেক উপাদান প্রয়োজন হয়। শুধু গরুর মাংশ কিংবা ইলশির মতো সুস্বাদু খাবার যেমন চুলোয় তুলে দিলেই খাবার হয় না, তেমনি শুধু ফেসবুকের অংশগুলো কপি পেস্ট করলেই খবর হয় না।
 
আর ফেসবুক যদি পুরো খবরই হয়, তাহলে সেটা কষ্ট করে মূল গণমাধ্যমে না দিলেও চলে। কারণ, সেটা সবার হাতে হাতেই পড়া হয়ে যায়।
 
হলুদ সাংবাদিকতার মতো ফেসবুক সাংবাদিকতা বন্ধ হোক।
 
তানভীর হাসান তানু
সংবাদকর্মী, ঠাকুরগাঁও।