07 May 2019   04:45:13 PM   Tuesday   BdST

ফেইসবুকে আমরা কী করছি

লেখক তনুশ্রী বিশ্বাস : ভার্চুয়াল দুনিয়াতে আমাদের প্রতিদিনই নতুন কোনো বিষয় নিয়ে ভাববার সুযোগ হয়। এভাবেও বলতে পারি, কোনো বিষয় নিয়ে তর্ক করার সুযোগ পাই। প্রতিদিনই আমাদের আশেপাশে কিছু না কিছু ঘটছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও ঘটছে।

 

আগে যাদের সাথে ঘটেছে এবং যাদের আশেপাশে ঘটেছে হয়তো সামান্য কয়জন মানুষ জানতে পেতো। এখন স্মার্টফোনের যুগে কোনো ঘটনা শুরু হলেই মোবাইলে ধারণ করি আর তা সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করি! তাই ছোট বড় সব ঘটনাই সোশ্যাল মিডিয়া বা ফেইসবুকের মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই জানতে পারি।

 

সব কিছু এত সহজ হওয়ার ফলে আমরা কেন যেন স্পর্শকাতর ঘটনাগুলোও খুব সহজভাবে নেওয়া শিখে গেছি। শুধু সহজভাবে নয়, সেটাকে মজার বিষয় বানিয়ে আবার দিনের সূর্য ডুবতে না ডুবতেই নতুন কোনও ঘটনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছি!

 

খুব সাম্প্রতিক ঘটনাই ধরি,’ঘূর্ণিঝড় ফণী’নিয়ে ‘নানান মুনির নানান মত’ পেয়েছি এই সোশ্যাল মিডিয়ায়ই! ঝড় যেটুকু বাইরে হয়েছে তার থেকে বেশি হয়েছে ফেইসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়াতে। তো যেদিন সবাই জানতে পারল একটা ঘূর্ণিঝড় হতে যাচ্ছে এবং তার নাম ‘ফণী’, সেদিন থেকেই অতি উৎসাহী যারা কি-না সব ঘটনা নিয়ে মত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন, তারা ব্যাপারটা কে নিয়ে খুব গবেষণা শুরু করে দিলেন।

 

ব্যাপারটা হচ্ছে, ফেইসবুকেই যেন একটা আবহাওয়া অধিদপ্তর খুলে বসল। প্রতি মুহূর্তেই ঝড়ের আপডেট দেওয়া শুরু করল। দিন যেতে না যেতেই তারাই আবার ঝড়টা নিয়ে মজা শুরু করল। ঝড়ের নাম নিয়ে মজা, ঝড় এখনো কেন আসছে না সেটা নিয়ে মজা, ঝড় হলে কী হবে না হবে সেটা নিয়ে বিভিন্ন ছবি বানানো থেকে শুরু করে অনেক কিছু করল।

 

অবশেষে ঝড়টা যখন হলো, ঝড়টা কেন এত হালকা হলো(!), কিছুই কেন হলো না এটা নিয়েও মজা করা শুরু হলো। কিন্তু ঝড়টা কিন্তু আসলেই শক্তিশালী ছিল। যাদের ক্ষতি হওয়ার তাদের ঠিকই অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে। আমরা যারা শহুরে মানুষ, দালানের উপর থেকে সেই উপকূলীয় মানুষদের বর্তমান অবস্থাটা বোঝার কথা না, অবশ্য বোঝার চেষ্টাও করি না।

 

ফণী’কে এত হালকা ভাবে নিয়েছে যে ফণী যেতে না যেতেই নতুন কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে বসেছে ফেসবুকবাসী! শুধু ঝড় না। প্রতিদিন অনেক ধরনের খবর আমাদের চোখে পড়ে, যেমন ধরুন ধর্ষণ। ধর্ষণ বর্তমানে এতই পরিচিত শব্দ যে এখন আমরা শব্দটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অভিব্যক্তিটা এমন থাকে যে-ও আচ্ছা ধর্ষণ! এ আর নতুন কি! তো যেই মেয়েটা ধর্ষণ হচ্ছে বা নির্যাতিত হচ্ছে, প্রথমদিন আমরা খুব হা-হুতাশ করি। খুব প্রতিবাদী হই, ধর্ষককে খুব গালি দিই, সরকারকে গালি দেই, ধর্ষককে গ্রেপ্তারের জন্য সেইদিন বিকালেই একটা মানববন্ধন এর ‘ইভেন্ট’ খুলে ফেলি ফেইসবুকে। এভাবেই একটা দিন কেটে যাই। পরের দিন কি টা রেশ থাকলেও বিকাল হতে হতে অন্য কোনো ঘটনায় মেতে উঠি।

 

ধর্ষণের মত এত নৃশংস ঘটনাকেও কিছু মানুষ খুব হালকাভাবে নিয়ে মেয়েটাকে দুষতে শুরু করে।ফেইসবুকেই মেয়েটার পরিবারের সবাইকে উদ্ধার করে ফেলে। মেয়ের পোশাককে দায়ী করে-মেয়েটা কেন পর্দা করে না তা নিয়ে তর্ক করে। এসবই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘটে।

 

নিউজ পোর্টালগুলোর কমেন্ট বক্সে গেলেই বোঝা যায় আমরা কত হালকাভাবে নিতে শিখে গেছি ‘ধর্ষণ’ এর মত ঘটনাকে। উদাহরণ দিলে শেষ হবে না। আমাদের সব কিছুই এখন সাময়িক। নিজেরাই আবার বলি, আরে ধুর দেখবি কালকেই সব ভুলে যাবে সবাই! আসলেই তাই, আমরা একটা বিষয় নিয়ে যতই মাতি পরেরদিন সেই ঘটনাটা কেউ মনে রাখে না।

 

এই মনে না রাখা নিয়েও আমরা মজা করি! দেখলি, খুব লাফাচ্ছিল না অমুক ঘটনা নিয়ে? এখন দেখ কারো মনে নাই! কথায় আছে না- মানুষ ঠেকে শেখে! তো, মজা নিতে নিতে একদিন যখন আমরা এইসব ঘটনার সম্মুখীন হব তখন বুঝতে পারব-ঠিক কতটা অসহায় হয়েছিল সেইদিন উপকূলের মানুষেরা, ঠিক কতটা কষ্ট পেয়েছিল ধর্ষণের শিকার মেয়েটি!

 

কোন ব্যাপারটায় হাসতে হবে আর কোন ব্যাপারটাকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে এই দুটোর মধ্যে আমাদের পার্থক্য করা শিখে নেওয়ার সময় এসেছে।এখনো যদি আমরা না শিখি, তাহলে আমরা যখন এমন বিপদে পড়ব তখন অন্যরা ঠিক এভাবেই হাসবে। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে হাসির খোরাক বানিয়ে দিন শেষে অন্য কোনো ঘটনায় মন দেবে।

 

সৌজন্য: jonojog.com..