18 Mar 2014   10:04:10 PM   Tuesday   BdST

ফাঁস হয়ে গেল সুচিত্রার আত্নহত্যার কারণ


তানভীর হাসান তানু/মাজেদুর রহমান সাদ্দাম
ঢাকা, ১৮মার্চ : কিশোরী-তরুণী জীবনে প্রেমই বড়, নাকি পরিবার? প্রেমিকই বড়, নাকি বাবা-মা? মনের গোপন কোণে তিল তিল করে বেড়ে ওঠা স্বপ্নপুরুষটাই কি বেশি নির্ভরতার, নাকি মায়ের নিরাপত্তার আঁচল? এসব প্রশ্ন অনন্ত, উত্তরহীন।

কিশোরী থেকে তরুণীতে পা রাখা সুচিত্রাও খুঁজে পায়নি এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর। তাই সে লিখেছিল, ‘জীবনে কিছু প্রশ্ন থাকে, যার কোনো উত্তর হয় না, যার লেখা কখনও মোছে না। কিছু ভুল থাকে, যা শোধরানো যায় না। আবার এমন বন্ধু থাকে যাকে কখনো ভোলা যায় না।’

অনন্ত প্রশ্নবাণে জর্জরিত সুচিত্রা শেষ গন্তব্যকেই বেছে নিয়েছে শ্রেষ্ঠ উত্তর হিসেবে। তাই অনুভূতির অক্ষরগুলো সাজিয়ে সে চলে গেছে জীবনের ওপারে। হয়তো কিছুটা আত্মতৃপ্তি থেকেই সর্বশেষে লিখেছে, ‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন/ মরণে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে এ ভুবন/ সুখের আশা করছি কেন, সুখ কি সবাই পায়/ তবু মোদের সুখকে ভেবে প্রহর কেটে যায়।’

সুচিত্রার অনুভূতির পুরোটা জুড়েই ছিল সেই স্বপ্নপুরুষ ‘রণবীর’ (ছদ্মনাম)। যার ভালোবাসার সঙ্গে আর কারো ভালোবাসার তুলনা করতে পারেনি সে। পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেয়ার আগ পর্যন্তও সে ইচ্ছে করেই কাউকে কিছু জানায়নি। না বাবা, না প্রেমিক।

ঘটনা জানার পর রণবীরের পৃথিবীটা অন্ধকারে ছেয়ে যায়। হাহাকারে লুটিয়ে পড়ে। রোধ করতে পারেনা আবেগ। এক সময় নিজেকে কিছুটা শক্ত করে ধরে স্মৃতিচারণ করে প্রেমিকার। বলতে থাকে, ‘সুচিত্রা আত্মহত্যা করেছে? আমার বিশ্বাস হয়না। ওকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। ও চলে গেলে আমি কি নিয়ে থাকবো। ও মরতে পারেনা।’ এরপর অশ্রুবিসর্জন চলতে থাকে।

এক পর্যায়ে আবারো মুখ খোলে, ‘বিকেলেই ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ভালোভাবেই কথা বলেছে। একদম স্বাভাবিক ছিল সে। ও যখন হোস্টেলে ফিরে গেল তখনও কথা হচ্ছিল। এক পর্যায়ে সে আমাকে একটি কবিতা শুনালো। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। সে বলল তুমি ভাল থেকে। অনেক ভালো। তারপর ফোনটা কেটে দিল। এরপর আর ফোন রিসিভ করেনি।’

হাউ মাউ করে কান্না জুড়ে দেয় রণবীর। বলে, ‘না, সে এখনও আমার। সে মরতে পারেনা।’

সুচিত্রা ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর এলাকার গোবিন্দ রায়ের মেয়ে। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ৯টায় ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের হোস্টেল থেকে পুলিশ তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে।

মেধাবী ছাত্রী সুচিত্রার মরদেহ হোস্টেল থেকে উদ্ধারের পর কান্নার রোল পড়ে যায় হোস্টেলসহ ক্যাম্পাসে। বান্ধবীরা ছুটে আসে। আসে বাবা-মা স্বজনরাও। অনলাইন নিউজপোর্টালে খবর প্রকাশ হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কৌতুহল দেখা দেয় তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে। এরপর শুরু হয় অনুসন্ধান। অবশেষে বেরিয়ে এসেছে তার আত্মহত্যার কারণ।

নিউজবুকবিডির অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুচিত্রা পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার সময়েই রণবীর (ছদ্মনাম) নামে এক তরুণের সঙ্গে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। এসএসসি পরীক্ষার পর ভালো ফলাফলের আশায় তার বাবা সুচিত্রাকে গত ২০১২ সালে ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি করে দেয়। ভর্তির পর থেকে সে কলেজের হোস্টেলেই থাকত।

সুচিত্রা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর রণবীরও ঠাকুরগাঁওয়ের একটি কলেজে ভর্তি হয়। সে ঠাকুরগাঁও শহরের একটি ছাত্রাবাসে থাকত। ফলে প্রায় প্রতিদিনই তাদের দেখা সাক্ষাৎ হতো। সম্প্রতি পরিবার তাকে সুচিত্রাকে বিয়ে দেয়ার জন্য পাত্র খুঁজতে থাকে। বিষয়টি জেনে সে তার প্রেমের সম্পর্কের কথা পরিবারকে খুলে বলে। কিন্তু পরিবার থেকে সাফ নির্দেশ দেয়া হয় ওই ছেলের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে। এক সময় তার পরিবার অন্য এক ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করে ফেলে। সে কথা জানার পর গত সোমবার বিকেলে হোস্টেল থেকে বের হয়ে সুচিত্রা সোজাসুজি চলে যায় রণবীরের কাছে। খুলে বলে সব কথা। সন্ধ্যায় হোস্টেল গেট বন্ধ হওয়ার কিছু আগে ফিরে আসে। ঘণ্টাখানেক কথা হয় রণবীরের সঙ্গে। এরপর তার কাছ থেকে বিদায় নেয়। সেই বিদায়ই ছিল তার মহাবিদায়।

সুচিত্রার চিরবিদায়ে এক জায়গা খুব মিল পাওয়া গেছে। রণবীর যেমন পাগল হয়ে গেছে তার প্রিয়তমাকে হারিয়ে, একই ভাবে ভেঙে পড়েছেন সুচিত্রার বাবা গোবিন্দ চন্দ্র বর্মন।

আহাজারি থামছে না বাবার। তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কী কারণে আমার মেয়ে সবাইকে ছেড়ে চলে গেল? আমরা বুঝতে পারছি না। অনেক আদরের মেয়ে ছিল সুচিত্রা। ভালো ফলাফল করার জন্যই ওকে এই কলেজে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু মেয়েটি আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’

সুচিত্রার রুমমেট তমা জানান, পরিবার সুচিত্রার সর্ম্পকের কথা মেনে না নেয়ায় সে খুবই দুশ্চিন্তায় ছিল। তার পরিবারের কারণেই সে আত্মহত্যা করতে পারে।

পুলিশ ও হোস্টেল সূত্রে জানা গেছে, সুচিত্রা সোমবার বিকেলে হল থেকে বের হয়। পরে হলে ফিরে তার কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। এর কিছুক্ষণ পর সহপাঠীরা কক্ষে ঢুকতে চাইলে দরজা বন্ধ দেখেন। অনেক ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় তারা জানালার পাশ থেকে সুচিত্রার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান। বিষয়টি হল কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে পুলিশকে খবর দেয়া হয়।

ঠাকুরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ খান জানান, ময়না তদন্তের পর লাশ সুচিত্রার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এ ঘটনায় থানায় একটি ইউডি মামলা হয়েছে।