16 Jun 2017   06:33:42 PM   Friday   BdST

পদ-পদবি থাকলে নেতা ও লিখতে জানলে সাংবাদিক হওয়া যায় না!

একটি দেশে একজন যোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তির দেশ ও সমাজ গঠনে অবদান যেমন অপরিসীম। তেমনি সৎ, নিরপেক্ষক সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকের গুরুত্বও কম নয়।

 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটের মাধ্যমে জয়ী হয়ে একটি রাজনৈতিক দল দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহন করবেন এটাই রীতি। আর মত প্রকাশের স্বাধীনতা সরকারের একটি গণতান্ত্রিক দলিল। বিভিন্ন দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় নাগরিকদের অবাধ বিচরণ করার সুযোগ আছে । আমাদের দেশেও সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সরকার গণতন্ত্রের প্রধান যন্ত্র বা মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসাবেই চিন্হিত যন্ত্র হচ্ছে গণমাধ্যম বা সাংবাদিকতা। আর অনেকেই বলে থাকেন গণমাধ্যম বা সাংবাদিকতা একটি সরকারের বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। দেশ পরিচালনা করতে গেলে সরকারের ভুল ক্রটি হতেই পারে এটাই স্বাভাবিক। আর সে ভূল ক্রটি গুলো তুলে ধরে সরকারের ভুল সংশোধনের কাজটি করে গণমাধ্যম।

 

সম্প্রতি দেশের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়নের ওয়ার্ড পর্যন্ত সরকার দলীয় সংগঠনের পদ-পদবি পাওয়া নেতা ও কতিপয় হাইব্রিড সাংবাদিকে ভরে গেছে। আর এই পদ-পদবি পাওয়া নেতা ও কতিপয় হাইব্রিড সাংবাদিকের অবাধ বিচরণে অতিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। থমকে যাচ্ছে সরকারের নানা উন্নয়ন কার্যক্রম।

 

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মত ঠাকুরগাঁওয়ে পদধারী নেতা ও নামধারী সাংবাদিকের কমতি নেই। এই কারণে হুমকীর শিকার হচ্ছেন অসহায় মানুষ ও যোগ্য নেতৃত্ব।

 

আগে গ্রাম বা কোন এলাকায় সৎ, বিনয়ী, নিষ্ঠাবান ব্যক্তিকেই একটি সংগঠনের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব দিত জনগণই। ওই সৎ ব্যক্তির কারণে এলাকায় উন্নয়নের কোন কমতিও ছিল না।

 

কিন্তু বর্তমানে কোন রাজনৈতিক সংগঠনে সৎ, নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়া যায় না। নানা অবহেলার কারনে যোগ্য ব্যক্তিরা রাজনৈতি থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছেন। আর যারা রয়েছেন তারাও সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না কতিপয় অসৎ ব্যক্তি বা নেতাদের কারণে।

 

বর্তমানে সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়নের কারণে তথ্য ও প্রযুক্তি মানুষের হাতের নাগালে ধরা দিয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তিকে কিছু সুবিধাভোগি ব্যক্তি ভাল কাজের থেকে মন্দ কাজেই ব্যবহার করছে বেশি। আর কিছু কতিপয় নেতা দেশের মন্ত্রী, এমপিদের সাথে ছবি তুলে ফেসবুকে পোষ্ট করে নিজেকে বড় নেতা দাবি করছেন নিজ নিজ এলাকায়।

 

এখন একজন রাজনৈতিক নেতা হতে গেলে যোগ্যতার প্রয়োজন পড়ে না। ক্ষমতা আর অর্থ থাকলেই কোন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবী পাওয়া যায়। জনগণও আর নেতা নির্ধারন করতে পারেন না। অর্থ ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এখন কতিপয় ব্যক্তি ঘরে বসেই বড় রাজনৈতিক নেতা হয়ে যাচ্ছেন রাতারাতি। আর অবহেলার কারনে লোক চক্ষুর আড়ালে চলে যাচ্ছেন যোগ্য নেতারা।

 

অপরদিকে শুনতে খারাপ শুনালেও বাস্তবতা প্রমাণ করে আইনের অপ্রতুলতা ও প্রয়োগের ব্যর্থতার কারণে দেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদ মাধ্যমগুলির মান দিনে দিনে নিম্নমুখী হচ্ছে। অনেক সুশীল ও সচেতন পাঠক মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন সংবাদ মাধ্যম থেকে। অন্যদিকে এর প্রভাব পড়ছে বস্তুনিষ্ঠ আদর্শ সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের উপর। এই অবক্ষয়ের কারণেই শ্রেণী বিভক্তি দেখা দিয়েছে সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমে।

 

যেমন হাইব্রিড সাংবাদিক, হাইব্রিড সংবাদ মাধ্যম, হলুদ সাংবাদিক ও হলুদ সংবাদ মাধ্যম। এই শ্রেণী বিভাগ এখন রাষ্ট্র কর্তৃকও স্বীকৃত, তাই তো সরকারের মন্ত্রী এমপিরাও এই হাইব্রিড এবং হলুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্যে নিন্দা জানাচ্ছেন।

 

সংবাদের বৈশিষ্ট্য সমুহ বজায় না রেখে যে সব সাংবাদিক ব্যক্তিগত স্বার্থে মনগড়াভাবে সংবাদ লিখেন তারাই হাইব্রিড বা হলুদ সাংবাদিকের শ্রেণীভুক্ত; এবং যে সব সংবাদ মাধ্যম এসব সংবাদ প্রচার করে সেগুলিই হাইব্রিড বা হলুদ সংবাদ মাধ্যমের শ্রেণীভুক্ত।

 

অথচ আশ্চর্যের বিষয় সংখ্যলঘু হাইব্রিড আর হলুদের চাপে অনেক আদর্শ সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যম কোনঠাসা হয়ে যাচ্ছে। আশা করি নতুন আইন হাইব্রিড ও হলুদদের বিলুপ্তি ঘটিয়ে আদর্শ সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমকে প্রেরণা যোগাবে।

 

অনেকেই মনে করেন কেউ কোন পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক পেইজে যে কোন খবর লিখে দিলেই উনি সাংবাদিক হয়ে গেলেন এবং পেইজটাও সংবাদ মাধ্যম হয়ে গেল। বিষয়টা কিন্তু মোটেও তা নয়। লিখতে জানলেই কিন্তু লেখক হওয়া যায় না, তেমনি খবর লিখলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। আদর্শ সাংবাদিক বা লিখক হতে হলে ব্যক্তিরও (সাংবাদিক) যেমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে তেমনি লেখার ও কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে।

 

সাংবাদিকতার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সততা, সৎ সাহস ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য।

 

তেমনি পদ-পদবি থাকলে যোগ্য নেতা হওয়া যায় না। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের পদ-পদবী পেয়ে ফেসবুকে যোগ্য নেতাদের সাথে ছবি পোষ্ট করে নিজেকে বড় নেতা ভাবাটাও ঠিক না ? আজকাল শুধু ফেসবুকে ও কোন মিটিং মিছিলে বক্তব্য দিয়েই নিজেকে বড় নেতা মনে করছেন বেশির ভাগ নেতারা। নেতৃত্ব দিতে চাইলে জনগনের দৌড়গোড়ায় যান, অবহেলিত মানুষের পাশে গিয়ে দাড়ান, এলাকায় উন্নয়নের জন্য কাজ করুন। দেখবেন জনগনই আপনাকে যোগ্য নেতার স্থানটি দেবে।

 

একজন যোগ্য নেতার ৬ টি গুনাবলি থাকা প্রয়োজন আমার মতে; ভিশন, বিনয়, আত্মসচেতন, ন্যায়পরায়ণ, কমিটমেন্ট, অন্যদের সাহায্য করা।

 

কিন্তু এই গুনাবলি বর্তমান বেশি ভাগ রাজনৈতিক নেতার মধ্যে নেই বললেই চলে। শুধু তেলবাজি করে জনগণের সাথে প্রতারণা করাই মূল লক্ষ্য হয়ে দাড়িয়েছে।

 

তাই একটি দেশের উন্নয়নের জন্য যোগ্য রাজনৈতিক নেতা ও সৎ নির্ভীক সাংবাদিকের গুরুত্ব অপরিহার্য।

 

লেখক: সাংবাদিক তানভীর হাসান তানু
ইত্তেফাক ও ইন্ডিনেডেন্ট টেলিভিশন
ঠাকুরগাঁও।