13 Jan 2014   02:11:50 PM   Monday   BdST

দুবাইতে বেতনভুক্ত বাংলাদেশি জেলেরা

নিউজবুক ডেস্ক
ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি : মাছ ধরা যেমন শখের তেমনি আমিরাত অধিবাসীদের বহু বছরের ঐতিহ্যও বটে। এমনকি খাদ্য তালিকায়ও অন্যতম জায়গা দখল করে আছে মাছ। একটা সময় আরবের অধিবাসীরা মাছ ধরতো শুধুই নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ছিপ-বঁড়শির সাথে যোগ হলো জাল ও জেলে। অর্থনৈতিক ভাবে বেশ চাঙ্গা থাকায় স্ব-শরীরে জাল হাতে সমুদ্রে নামতে হয় না তাদের। বেতন ও কমিশনে পাওয়া যায় শ্রমিক। জীবিকার সন্ধানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছুঁটে আসা ভিনদেশি শ্রমিকদের সহযোগিতায় মাছ ধরা ও বিক্রিকে পেশা হিসেবেও গ্রহণ করেছেন অনেক অধিবাসী। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একক ও যৌথ মালিকানায় নিয়ন্ত্রণে মৎসজীবিদের ভাগ্য ও মৎস ব্যবসা।

শহরে বসে এ পেশায় ব্যস্ত মানুষদের দেখার সুযোগ নেই। তাদের দেখা মিলবে শহর থেকে দূরে সমুদ্রের কিনারায়। যেখানে এদের জীবন-জীবিকা। আরব আমিরাতের রাস-আল-খাইমাহ, ফুজিরাহ, আজমান ও দুবাইয়ের সমুদ্র সীমানায় মাছ ধরা ও বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করেন এরা। এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে ভারতীয় ও বাংলাদেশি শ্রমিক। এদের একটি বড় অংশই বেতনভুক্ত কর্মী। বাকিদের অনেকেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ। আবার কেউ কেউ অধিবাসীদের সাথে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যেমে লভাংশের সমান অংশীদার।

কথা হয়েছিলো ফুজিরাহ শহরের কালবা ও রাস-আল-খাইমাহ সমুদ্র বন্দরস্থ কিছু শ্রমিকের সাথে। জানালেন তারা আশা আর হতাশার কথা। সাত’শ থেকে হাজার দিরহাম বেতনে চাকুরী তাদের। ভোর থেকে সন্ধ্যা সারাদিন কাটে সমুদ্রে। চলতে হয় মালিক পক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী। অনেকের বেতন নির্ভর করে মাছ ধরার উপর। যত বেশি মাছ তত বেশি বেতন। তবে কাউকেই গভীর সমুদ্রে একা যেতে হয় না। প্রতিটি দলে প্রায় ষোল থেকে বিশ জন শ্রমিক থাকলেও পাঁচ-সাত জনের দলাবদ্ধ হয়ে জাল ফেলে সমুদ্রে।

মাছ ধরার সরঞ্জাম খুবই ব্যয়বহুল। জাল, গাড়ি ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা ছাড়াও সব ধরনের মাছ ধরার যন্ত্রপাতির জন্যই চড়া দাম দিতে হয়। এসব সরঞ্জাম যাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে তারা নিজেরাই ঠিকাধারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্তাধিকারী। যাদের এটুকু নেই তারা কেউ বেতনে, কেউ কমিশনের কাজ করে জীবন-জীবিকার চাকা সচল রাখছে প্রতিনিয়ত। সরঞ্জাম ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে না থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনেক শ্রমিক আরবের অধিবাসীদের সাথে পার্টনারশীপ চুক্তি করে লভাংশের সমান অংশীদার হচ্ছে। মালিক পক্ষ তথা অধিবাসীদের সৌজন্যবোধ ও ভক্তি দেখিয়ে ‘লভাংশের সমান ভাগ’ এমন চুক্তি করা গেলে জাল সহ সব সরঞ্জামই মাছ ধরার কাজে ব্যবহারের জন্য মিলে বিনামূল্যে। নিজেদের লাভের কথা মাথায় রেখে দায়িত্ব নিয়ে ঐসব অধিবাসীরাই সব সরঞ্জামের ব্যবস্থা করেন।

সকালে শ্রমিকদের কাজে নামতে হয়। অনেকেই আবার রাতেও জাল নিয়ে সমুদ্রে যায়। বিশাল এলাকা জুড়ে জাল পেলে অপেক্ষা করতে হয় কয়েক ঘন্টা। নির্দিষ্ট সময় শেষে জাল তোলার জন্য সহযোগিতা নিতে হয় ছোট-বড় পিকআপ ও ফোর হুইল গাড়ির। কারণ দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত জালটি মানুষের দ্বারা টেনে তোলা সম্ভব নয়। ঐসব গাড়ি গুলোর সাথে জালের প্রান্তদেশ মোটা দড়িতে বেঁধে ধীরে ধীরে তীরে আনতে হয়। এতে সময় লাগে প্রায় ঘন্টাখানেক। জাল কিনারায় এলে তীরে অপেক্ষমান শ্রমিকরা জাল থেকে মাছগুলো উঠিয়ে নেয়। এরপর মাছ আড়তে পাঠানো হয়। যথাসময়ে উপস্থিত থাকলে সমুদ্র থেকে তুলে আনার সঙ্গে সঙ্গেও মাছ কেনার সুযোগ থাকে।

রাস-আল-খাইমাহ, ফুজিরাহ, শারজাহ ও আজমানে রয়েছে মাছের বিশাল আড়ত। আড়তে মাছ পাইকারী দামেই বিক্রি হয়। ঠিকাদারদের উপস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতের মাছের অনির্দিষ্ট মূল্যে ডাক তোলা হয়। নিজেদের পছন্দ ও দামের সাথে সমতা থাকলে কিনে নেন পাইকারী ব্যবসায়ীরা। এখান থেকে মাছ পৌঁছে যায় সমগ্র আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবী, আল-আইন, শারজাহ, ফুজিরাহ, রাস-আল-খাইমাহ, আজমান সহ বড় বড় মৎস বিক্রয় কেন্দ্রে।

নিজেদের কাজ ও আয় সম্পর্কে শ্রমিকরা জানালেন, মালিক পক্ষ থেকে জাল নিয়ে মাছ ধরতে হয়। সাথে অন্য সব সরঞ্জামও মালিকপক্ষই দিয়ে থাকে। জাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোন খরচ বহন করতে না হলেও জাল টানার কাজে নিয়োজিত গাড়ি গুলোতে পেট্রোল খরচ পড়ে প্রায় পাঁচ’শ দিরহাম। প্রতিদিন মাছ সংগ্রহ ও বিক্রি হলেও লাভ-ক্ষতির হিসেব হয় মাস শেষে। মৎস খাত থেকে প্রতিমাসে প্রায় ৬৪ থেকে ৭০ হাজার দিরহাম আসে। কখনও কখনও এর চেয়েও বেশি আয় হয়। মাস শেষে এই অর্থ থেকে যাবতীয় খরচ বহন সহ শ্রমিকদের বেতন দিতে হয়। আর লভাংশের ভাগ হয় সমান দুই ভাগে। একভাগ যায় সরাসরি মালিক পক্ষের হাতে অন্যভাগ ঠিকাধারী প্রতিষ্ঠানের হিসেবের খাতায়। গড়ে শ্রমিকের মজুরি পড়ে সাত’শ থেকে একহাজার দিরহাম। যারা যৌথ মালিকানায় কাজ করে তারা জনপ্রতি প্রায় বিশ হাজার দিরহাম করে আয় করেন।


নিউজবুকবিডি/২০১৪