05 Jul 2018   03:43:55 AM   Thursday   BdST

জানি তুই ভালো নেই

কেমন আছিস জিজ্ঞেস করব না। জানি তুই ভালো নেই। তোর প্রিয়জনেরা কেউ ভালো নেই। তুই সবসময় সবার কথা ভাবতি, সবার ভালো চাইতি। এই সময়ে সবার মন খারাপ থাকলে, তুই কিভাবে ভালো থাকিস বল?
 
এখানে সবাই তোকে সেজান নামে চেনে। কিন্তু তুইতো আমার কাছে সেজান ছিলি না। ছিলি সৌরভ। আমার প্রিয় সৌরভ। সদা হাসিমুখের সৌরভ । ছোট্টবেলার মোটু সৌরভ। এখনো ফোনে তোর নম্বরটা মোটু সৌরভ নামে সেভ করা আছে। দোস্ত, এখনকি নম্বরটা ডিলিট করে দিব?
 
সেদিন সবাই তোর সাথে পরিচয়ের গল্প করছিল। আমি শুধু শুনছিলাম। কি বলব! তোর সাথে যখন আমার পরিচয় তখন আমাদের নেংটা থাকার বয়স। একসাথে স্কুলে ঢুকলাম। বয়স তখন সাড়ে তিন কি চার। এরপর পুরো স্কুল লাইফটা শেষ হলো। কলেজে দুই বছর বাদে প্রায় একই সময়ে একই ক্যাম্পাস থেকে এসে ঢুকলাম এই ঘাতক শহরে। এই পুরোটা সময়ের গল্প বলা সম্ভব? কোনটা রেখে কোনটা বলব বল!
 
প্রতি ঈদে বড়মাঠে, শুভর চেম্বারে আড্ডা দেয়া ছিল ফরয কাজ। আগেই ফোনে কথা হতো। টিকিট পেয়েছিস কিনা? সাথে কে যাবে? কিভাবে যাবি? আরো কতো কি! এবার ঈদ করলি ঢাকায়। বললি, এবার ঈদে ঠাকুরগাঁও যেতে পারলাম না। পরের ঈদে যাব। সেই তুই ঠাকুরগাঁও ঠিকই গেলি! কিন্তু এভাবে কেন?
 
মুনিয়া আমার ক্যাম্পাস লাইফের সবচেয়ে কাছের ছোটবোন । ও যখন তোর লাইফে এলো ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। ওকে বলেছিলাম, কখনো ভাবি ডাকতে পারব না। তুমি বোন হয়েই থাকবে। জব হলো, বিয়ে করলি, সংসার সাজালি। ফোনে বলছিলি, `আয়, একদিন বাসায় ঘুরে যা। আমাদের টোনাটুনির সংসার। ভয়ংকর ব্যস্ততার অজুহাত দিবি না।` কথা দিয়েছিলাম, রাখতে পারলাম কই? এ শহরের `ভয়ংকর ব্যস্ত` জীবন তোর কাছে অপরাধী করে রাখল।
 
সেদিন খবরটা শুনার পর মনে হয়েছিল এটা মিথ্যে। তুই মরবি কেন? আদাবর থেকে হাসপাতাল অবধি আক্ষরিক ভাবেই ছুটে গিয়েছি। পথেই শুনলাম তুই নেই! মেনে নেইনি। হাসপাতালে গিয়ে যখন দেখলাম তোকে শুইয়ে রাখা হয়েছে, তখন নিজের ভেতর কেমন একটা অদ্ভুত শূন্যতা ভর করেছিল। তখনই জানলাম, তুই মরিসনি। তোকে মেরে ফেলা হয়েছে!
 
মোটু, মাফ করে দিস। আমরা তোর ঘাতকের বিচার করতে পারিনি। আদতে বিচার চাইতেও পারিনি। সেদিন হাসপাতালে সেলিনা আন্টি যখন বললেন, `কার কাছে বিচার চাব? কে দেবে? কবে দেবে? এর চেয়ে আমার ছেলের শরীরটা অক্ষত থাক।` ভাবলাম, এটাই ভালো। আসলে তুই একটা ভুল দেশে, ভুল সময়ে জন্মেছিলি। ভুল দেশকে ভালোবেসেছিলি। এটাই তোর, আমার, আমাদের পাপ।
 
সেদিন তোর শুইয়ে রাখা শরীরটা কাছে থেকে দেখার সাহস হয়নি। আদতে ইচ্ছে করেনি। চেয়েছিলাম, তোর ওই হাসিমাখা মুখটা সারাজীবন মনের কোনে ধরে রাখব। তাই আর সাদা কাপড়টা সরিয়ে তোকে শেষ দেখা দেখিনি। হাত বাড়িয়ে ছুইনি। রাগ করিস না প্লিজ। 
 
ওপার থেকে সবই দেখছিস। সবাইকে দেখছিস। আংকেল, আন্টি, সুপ্তি, মুনিয়া, সবাইকে। প্রিয় ক্যাম্পাস, তোর স্কুল, নতুন ফ্ল্যাট, প্রিয় বাইকটা। কেমন লাগছে বলনা? ওপারে কি তোর খুব একা লাগে? এপারে মুনিয়া একা হয়ে গেছে। মাঝেমাঝে ওর কাধে আলতো ছুয়ে বলে যাবি `ভালোবাসি তোমাকে`....
 
ইতি,
তোর `ভয়ংকর ব্যস্ত` বন্ধু
অনিন্দ্য সাইমুম ইমন