21 Apr 2019   12:24:20 PM   Sunday   BdST

ও ভাবি গো! ছাদের উপরে ঐডা কি!

শাপলা জাকিয়া লেখক: চিৎকার শুনে তড়িঘড়ি খাট থেকে নামি। খাওয়া দাওয়ার পর দুপুর বেলা আয়েশ করে টিভি দেখতে বসেছিলাম। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। এরকম বৃষ্টিতে ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। আজ যায়নি। নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিয়ে রোজকার মতো তাই টিভির সামনে বসে গেছি। এ সময়টায় একটা চ্যানেলে লাইভ দেখানো হয়। একজন সাইকোলজিস্ট দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

 
সাইকোলজিস্টের মজাদার উত্তর ছেড়ে কিছুটা উৎকণ্ঠা নিয়ে ডাইনিং স্পেসে আসতেই জোহরাকে দেখতে পেলাম।
 
 
প্রায় পাঁচ ফিট ছয় ইঞ্চি লম্বা, কালো মেয়েটা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। এক মাস হলো ও কাজে লেগেছে এই বাড়িতে। যদিও সাঁওতাল নয় কিন্তু দেখতে ওকে সাঁওতাল নারীদের মতো লাগে। বয়স উনিশ-কুড়ি হবে। জোহরার সারা শরীর থেকে পানি গড়িয়ে ফ্লোর ভিজে যাচ্ছে। আমাকে দেখে জোহরা আবার বললো,
 
 
-ভাবি গো! ছাদে আমি কী দেখলাম!
 
 
-কি দেখেছো?
 
 
-এক বেডি ছাদে গোসল করে, বৃষ্টিতে! গায়ে কুনো কাপড় নাই!
 
 
-কী!
 
 
-হ ভাবি! আমি ছাদে গেসিলাম গোসল করতে । বাথরুমে যাই নাই। বৃষ্টি হইতেছিল বলে ছাদেই ভিজতেছিলাম। হঠাৎ চাইয়া দেহি বাথরুমের ছাদের উপরে এক ফর্সা বেডি ভিজতেছে, গায়ে কুনো কাপড় নাই। আমি দেইখা চিৎকার দিছি পরে আমার দিকে তাকাইছে। চৌখটা জানি কিমুন। এইডা মানুষ না ভাবি! এইডা অন্য কিছু।
 
 
আমি জোহরার কথার উত্তরে বললাম,
 
 
- কোন পাগলী হবে। নিচের মেইন গেইট খোলা পেয়ে হয়তো ওপরে উঠে গেছে। তুমি যখন ছাদে গিয়েছো, ছাদের গেইটে তালা ছিল না?
 
 
-হ ভাবি, আমি চাবি দিয়া তালা খুইলা ছাদে ঢুকছি। তালা দেয়া ছাদে পাগলী কেমনে ঢুকবো?
 
 
-তুমি তিন তলার কাজের মেয়েটাকে নিয়ে আবার ছাদে যাও। দেখো পাগলীটা এখনও আছে কিনা। থাকলে ওকে একটা কাপড় পরিয়ে বিদায় করতে হবে।
 
 
-আপনে আহেন।
 
 
-না রে বাবা, আমি পাগল-টাগল ভয় পাই।
 
 
জোহরা চলে গেলে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ডাইনিং রুমের চেয়ারে বসলাম। এরা কেন যে বাড়িতে দারোয়ান রাখে না! তাহলে এমন উটকো লোকজন বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারতো না।
 
 
আমার বিয়ে হয়েছে মাস ছয় হলো। এটা আমার শ্বশুরবাড়ি। বাড়িটা চারতলা । দোতলায় আমরা থাকি। আমরা মানে, আমি, আমার বর নিলয়, শ্বাশুড়ি মা, বিধবা ও নিঃসন্তান ফুপু শাশুড়ি আর এই জোহরা। বাড়ির অন্য ফ্লোরগুলি ভাড়া চলে।
 
 
এই বাড়ির ছাদে ফুলের বাগানের পাশাপাশি একটা কলপাড় ও বাথরুম আছে। এই বাড়ির সব ফ্ল্যাটের কাজের মেয়েরা ঐ বাথরুম ব্যাবহার করে। ছাদে তালা দেয়া থাকে। প্রত্যেক তলায় একটা করে চাবি দেয়া আছে। কাজের মেয়েগুলি রাতের বেলাতেও ছাদেই যায় প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে। কখনও কেউ ভয় পেয়েছে, এমন ঘটনা আমাকে এখন পর্যন্ত কেউ বলেনি।
 
 
কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো জোহরা ও তিনতলার কাজের মেয়ে নাহার । নাহার চুপচাপ,শান্ত ধরনের। জোহরার বয়সীই হবে। বহুদিন ধরে আছে তিনতলার পৌড় ভদ্রমহিলার সাথে। ছেলে-মেয়েরা দেশে-বিদেশে যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ভদ্রমহিলা তাদের কারও সংসারে গিয়েই থাকতে রাজি নন। ছেলে মেয়েরা তাই নাহারের হাতে মাকে দেখাশোনার ভার দিয়ে রেখেছে। নাহার বললো,
 
 
-ভাবি! ছাদে কেউ নাই!
 
 
জোহরা বললো,
 
 
-ওটা ভূত আছিলো। তাই অহন নাই!
 
 
নাহার বললো,
 
 
-এতো বছর এই বাড়িতে আছি, রাত দুইটা তিনটাতেও একা একা ছাদে গেছি। কখনও কিচ্ছু দেহি নাই। কী কয় এইগুলা, দুপুর বেলা ভূত আইছে বলে, হি হি!
 
 
এবার জোহরাও একটু লজ্জা পেয়ে হাসে।
 
 
আমি বললাম,
 
 
-পাগলীই হবে। জোহরাকে দেখতে পেয়ে চলে গেছে। ছাদ খোলা রাখে কে? যারা ছাদের বাথরুম ব্যাবহার করে সবাইকে বলে দেবে, যেন ছাদে তালা লাগাতে ভুলে না যায়। জোহরা তবু বলে,
 
 
-বাথরুমের ছাদে কেমনে উঠছিল? সিঁড়ি, মই কিছুতো নাই।
 
 
আমি বললাম,
 
 
-উঠছে কোনভাবে। ছাদের রেলিং এর কাছাকাছি বাথরুমের ছাদ। রেলিং থেকে বেয়ে উঠতে পারে।
 
 
-মাগ্গো মা! যদি নিচে পড়তো!
 
 
আমার আর এটা নিয়ে আলোচনা ভালো লাগছিল না। আজ নিলয়কে বলতেই হবে, একটা দারোয়ান ঠিক করার জন্য। আজ পাগলি উঠে এসেছে, কাল চোর বা ডাকাত উঠে আসবে না, কে বলতে পারে! নানা কিসিমের ভিক্ষুক তো প্রতিদিন আসে। ভিক্ষুকের বেশে চোরও যে খোঁজ খবর করতে আসে না, তা কে বলতে পারে!চার রাম্তার মোড়ে বাড়ি। দশটা লোকের চোখে পড়ে। গেটেও দারোয়ান থাকে না। যার মন চাইছে, ঢুকে পড়ছে!
 
 
নাহার চলে যেতেই নিজহাতে ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে জোহরাকে বললাম,
 
 
- তোমার আর ছাদে যাওয়া লাগবে না। কিচেনের লাগোয়া বাথরুমে গোসল শেষ করো। খাবার কিচেনে রাখা আছে, খেয়ে নেবে। আর আমাকে ডাকবে না, আমি এখন একটু রেস্ট নেবো।
 
 
নিজের রুমে ফিরে এসে দেখি টিভিতে আগের প্রোগ্রামটা শেষ হয়ে এখন রবীন্দ্রসংগীত শুরু হয়েছে। কিন্নর কন্ঠে শিল্পী গাইছেন, "এখনও তারে চোখে দেখিনি, শুধু বাঁশী শুনেছি.... " প্রিয় গান। শুনতে শুনতে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।
 
 
নিলয় অফিস খেকে ফিরবে সন্ধ্যায় আর শ্বাশুড়ি মা, ফুপু শ্বাশুড়িকে নিয়ে গেছেন এক আত্মীয়ের বাড়ি। আমি তাই বাড়িতে একা। তেমন কোন কাজ নেই, টেনশন নেই। মেহমান আসারও তাড়া নেই, যেটা প্রায় প্রতিদিনই থাকে। বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়াটা খুব আরামদায়ক। কেমন একটা সুখ-সুখ লাগে। টিভি দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। ঘুম ভাঙ্গলো জোহরার চিৎকারে। সে আমার রুমে ঢুকে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙ্গিয়েছে। এখন চিৎকার করে তার সাথে বারান্দায় যেতে বলছে।
 
 
খুব বিরক্ত হয়ে বললাম,
 
 
-কী শুরু করলে! কি হয়েছে?
 
 
-আপনে বারান্দায় আহেন ভাবি। ঐ বেডিরে আবার দেখছি। পাশের বাড়ির ছাদে। আমি বারান্দায় বসে বাদাম খাইতেছিলাম। আমার কাছে ইশারায় বাদাম চায়। এখনও গায়ে কুনো কাপড় নাই। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা চুলে শরীর ঢাকছে। বেডি ফর্সা -ও! এক্কেরে সাদা!
 
 
শাড়ির আঁচল সামলে আমি গেলাম কিচেনের পাশের বারান্দায়। সেখানে বাদামের খোসা পড়ে রয়েছে। জোহরা যে বাদাম খাচ্ছিলো, সে কথা সত্য, কিন্তু পাশের দোতলা বাড়ির ছাদে কাউকে দেখলাম না।
ঘাড় ঘুরিয়ে জোহরাকে বকা দিতে যাচ্ছিলাম কিন্তু ওর দিকে তাকিয়ে ভয়ে আমার শরীর হিম হয়ে গেল!
 
 
চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে জোহরার। কেমন হীংস্র দেখাচ্ছে। সে ভারি ও রাগী গলায় বললো,
 
 
-আমি মিথ্যা বলতেছি না। আমি ঐ বেডিরে দেখছি। আপনে বিশ্বাস যান না কেন?
 
 
জোহরা এত উদ্ধত সুরে কখনো আমার সাথে কথা বলেনি আগে। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, কিছু একটা অস্বাভাবিক! খুব অস্বাভাবিক! নিজের অজান্তেই আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করেছি আমি। জোহরা যেন বুঝতে না পারে এইভাবে ওর দিকে ফুঁ দিলাম আয়াতুল কুরসি পড়া শেষে। কোনরকমে বললাম,
 
 
-সরে দাঁড়াও।
 
 
জোহরা সরলো না।
 
 
আমি একহাতে শাড়ির কুঁচি উঁচু করে ধরে, আরেক হাতে জোহরাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে, দিলাম এক দৌড়!
 
 
কিচেনের বারান্দা থেকে দৌড়ে ডাইনিং, ড্রইং রুম পাড় হয়ে নিজের বেডরুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলাম ভিতর থেকে। আমার কেন যেন আতংক লাগছে, প্রচণ্ড আতংক! আমি ঘামছি। অথচ এতো ভয় পাওয়ার মতো কিছু হয়নি। আমি ভয়ে এভাবে দৌড়ে দরজা বন্ধ করেছি শুনলে বাড়ির অন্য লোকেরা নিশ্চয় হাসাহাসি করবেন। 
 
একটু লজ্জা পেয়ে দরজা খুলে দেবো ভাবছিলাম। কিন্তু তখনই বন্ধ দরজায় দুমদাম ধাক্কা পড়তে লাগলো। জোহরা রাগি গলায় দরজা খুলতে বলছে আর সম্ভবত লাথি দিচ্ছে দরজায়। আমি ছিটকিনির দিকে তাকালাম, ভেঙ্গে পড়বে না তো! ড্রেসিং টেবিলটা ঠেলে দরজার সামনে নিয়ে আসলাম!
 
 
যা ভেবেছি তাই! জোহরার ধাক্কায় দরজার ছিটকিনি ভেঙ্গে গেছে। সে এবার ড্রেসিং টেবিল ঠেলে সরানোর চেষ্টা করছে। তারমুখে ক্রুর হাসি! জোহরা কেন এমন করছে? একা বাড়িতে আমাকে পেয়ে ভয় দেখিয়ে গয়নাগাটি নিয়ে পালানোর মতলব?
 
 
আমি মোবাইলটার খোঁজে দ্রুত ঘরের চারপাশে নজর বোলালাম, নেই!
 
 
ড্রেসিং টেবিলের ওপর জমজমের একটা পানির বোতল। গতকাল নিলয় এনেছিল অফিস থেকে। ওর এক কলিগ হজ্ব করতে গিয়ে নিয়ে এসেছেন। আমি দ্রুত বোতলের মুখ খুলে সেই পানি জোহরার মুখে বিসমিল্লাহ বলে ছুঁড়ে মারলাম।
 
 
কাজটা করলাম দুইটা কারণে, মানুষের গায়ে পানি ঢেলে দিলে সে কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায়, সেই সুযোগে চট করে সরে পড়া যায়। পানি গায়ে পড়লে জোহরা যখন থমকে যাবে তখন আমি দ্রুত ওয়াশ রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতে পারবো। ড্রেসিং টেবিল সরিয়ে আমাকে ধরতে ওর ততোক্ষণে দেরি হয়ে যাবে।
 
 
আর দ্বিতীয়ত, যদি পুরো ব্যাপারটার পিছনে ভৌতিক কোন কারণ থাকে তবে জমজমের পানি গায়ে পড়লে জোহরা সরে যাবে। জীবনে ভূত বা ভূতে পাওয়া কাউকে আমি কখনো সামনা সামনি দেখিনি। কিন্তু তবু আমি ভৌতিক ব্যাপারগুলিকে ভুয়া বলে উড়িয়ে দিতে পারি না। ধর্মে বিশ্বাসের কারণে জ্বিনের অস্তিত্বেও বিশ্বাস করি।
 
 
আমি ভেবেছিলাম পানিটা ছুঁড়ে দিয়েই আমি ওয়াশ রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করবো। কিন্তু সেটা আর করতে হলো না। পানি গায়ে পড়া মাত্রই জোহরা তীক্ষ্ণ স্বরে একটা চিৎকার দিয়ে ছুটে পালালো!
 
 
তার এক মিনিট পরেই ডোরবেল বেজে উঠলো,
 
 
-টিং টং!
 
 
মা আর ফুপু কি ফিরলেন? আশার আলো জ্বলে উঠলো মনে। কিন্তু সদর দরজা খুলতে হলে আমাকে এই রুমের বাইরে যেতে হবে। ড্রইং, ডাইনিং পার হয়ে তবে দরজার কাছে পৌঁছাতে হবে। এখন বাইরে যাওয়া কি ঠিক হবে? বের হলেই যদি জোহরা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার ওপর। হয়তো সে দরজার পাশে ঘাপটি মেরে আছে!
 
 
আবার এমন তো না যে, জোহরাই ডোর বেল বাজিয়ে আমাকে রুম থেকে বের করার ফন্দি এঁটেছে?