23 Apr 2019   12:42:25 PM   Tuesday   BdST

আজ ২২ এপ্রিল মহান নেতা কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন এর জন্মবার্ষিকী।

লেখক মনজুরুল হক :  শুভ এবং শুদ্ধতম জন্মদিন বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশের নির্মাতা-ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন!

 

আজ ২২ এপ্রিল মহান নেতা কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন এর জন্মবার্ষিকী। ১৮৭০ সালের এদিনে তিনি রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শ্রমিক শ্রেণীর মহান শিক্ষক ও নেতা, ১৯১৭ অক্টোবর রুশ বিপ্লবের প্রধান স্থপতি কমরেড ভ্লাদিমির লেনিনের ১৪৯তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন। হৃদয়ে চিরস্থায়ী হোন কমরেড!

 

অন্যান্যবার তাঁর জন্মদিনে তাঁরই উদ্ধৃতি, বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে লেখাটা সাজাই। এবার মনে হলো বলশেভিক পার্টির ইতিহাসের সামান্য একটু অংশ হলেও প্রচার করা উচিৎ, কারণ সেই ১৯১৭ সালে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশের স্রষ্টা হয়েও আজ কাউৎস্কি আর তাদের স্যাঙ্গাতদের বজ্জাতিতে লেনিনের সেই চিরভাস্বর বলশেভিক পার্টির নামে বিষোদ্গার শুনতে হয়। আজও নষ্ট পুজিঁবাদী বীজ ততধিক নষ।ট আবর্জনা তৈরি করে তাকে `দ্বান্দ্বিক সমালোচনা` বলে চালান করতে চায়....।

 

১৯১৭ সালের ৭ অক্টোবর লেনিন ফিনল্যান্ড থেকে গোপনে পেট্রোগ্রাডে ফিরে আসেন এবং ১০ অক্টোবর তারিখে পার্টির কেন্ত্রীয় কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে যোগদান করেন। এখানেই পরবর্তি কয়েক দিনের মধ্যে সশস্ত্র অভ্যুত্থান শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কামেনভ ও জিনোভিয়েভ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন। তবে তাদের বক্তব্য কেন্দ্রীয় কমিটিতে খারিজ হয়ে যায়। আর ট্রটস্কি সরাসরি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা না করেও একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি প্রস্তাব করেন সোভিয়েতগুলির দ্বিতীয় কংগ্রেস শুরু হওয়ার আগে যেন এই অভ্যুত্থানের আয়োজন না করা হয়। তার এই প্রস্তাবের অর্থ হতো অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা ফাঁস হয়ে যাওয়া, অভ্যুত্থানে বিলম্ব ঘটা ও সাময়িক সরকারকে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। তাই কেন্দ্রীয় কমিটিতে এই প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়।

 

অভ্যুত্থানের জন্য বলশেভিকরা সামগ্রিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। অভ্যুত্থানের প্রস্তুতির জন্য বলশেভিক পার্টি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি পাঠায়। বিভিন্ন প্রদেশে অভ্যুত্থান পরিচালনা করার জন্য পার্টি বিশেষভাবে ভরশিলভ, মলোটভ, ঝেরঝিন্সকি, অর্জনিকদজে, কিরভ, কাগানোভিচ, কুইবিশেভ, ফ্রুনজে য়ারোস্লভস্কি, ঝদানভ প্রভৃতি কমরেডদের হাতে ন্যস্ত হয়। পেট্রোগ্রাড ও মস্কো সোভিয়েতে অধিকাংশ আসন বলশেভিকদের দখলে আসার পর লেনিন মত দেন, বলশেভিকদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা উচিত। শ্রমিক ও সৈনিকদের সোভিয়েতের আসন্ন অধিবেশন শুরু শুরু হওয়ার দিনে এই অভ্যুত্থানের দিন ধার্য হয়। কিন্তু পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের এক সভায় ট্রটস্কির বক্তব্যে অভ্যুত্থান আরম্ভ করার দিনের খবর ফাঁস হয়ে যায়। উদ্ভুত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অভ্যুত্থান শুরুর সময় এক দিন এগিয়ে সোভিয়েতের অধিবেশন শুরুর আগের দিন পুনর্নির্ধারণ করা হয়।

 

একদিকে বলশেভিকদের নেতৃত্বে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের চেষ্টা চলে, অপরদিকে বিপ্লব বিরোধিরাও দ্রুত নিজেদের সকল শক্তি সমবেত করার চেষ্টা করে। কেরেন্সকি সরকার পেট্রোগ্রাড থেকে রাজধানী মস্কোতে সরিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করে এবং পেট্রোগ্রাড জার্মান সেনাবাহিনীর হাতে তুলিয়া দিয়া বিপ্লব ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র আঁটে। কিন্তু পেট্রোগ্রাডের শ্রমিক ও সৈনিকদের বিক্ষোভের মুখে কেরন্সকি এই সিদ্ধান্ত অগ্রসর করতে পারে না। ১৬ অক্টোবর কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভা হয়। এই সভায় কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান পরিচালনার জন্য এক পার্টিকেন্দ্র নির্বাচিত হয়। ইতিমধ্যে ১৮ অক্টোবর তারিখে কামেনভ ও জিনোভিয়েভ মেনশেভিকদের পত্রিকা নোভায়া ঝিঝন এ এক বিবৃতি দিয়ে অভ্যুত্থান বিরোধিতার নামে বলশেভিকদের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা প্রকাশ করে দেয়। লেনিন একে বেঈমানী হিসাবে বর্ণনা করেন এবং জিনোভিয়েভ, কামেনভকে পার্টি থেকে বহিষ্কারের প্রস্তাব করেন।

 

এই প্রেক্ষাপটে কেরেন্সকি সরকার এক গোপন সভা করে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান পরিচালনার ব্যবস্থাদি সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯ অক্টোবর যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে সেনা প্রত্যাহার করে পেট্রোগ্রাডে জড়ো করে। সরকার রাস্তায় রাস্তায় বহু সশস্ত্র প্রহরী মোতায়েন করে। সরকার বলশেভিক পার্টির সদর দপ্তর স্মোলনি আক্রমণ ও দখল করার এবং বলশেভিকদের পরিচালনা কেন্দ্র ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে। ২১ অক্টোবর তারিখে বলশেভিকদের পক্ষ থেকে অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি তদারকি করার জন্য বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাগুলিতে কমিসার পাঠায়।

 

অভ্যুত্থানের খবর আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ২৪ অক্টোবর সকালেই কেরেন্সকি সরকার বলশেভিকদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। সাময়িক সরকার বলশেভিকদের মুখপত্র ‘রাবোচি পুৎ’ বন্ধ করার নির্দেশ জরি করে এবং কাগজের সম্পাদকীয় অফিস ও ছাপাখানায় সাঁজোয়া গাড়ি ছুটে যায়। কমরেড স্তালিনের নির্দেশে লালরক্ষীরা সকাল দশটার মধ্যে সাঁজোয়া গাড়িগুলিকে হটিয়ে দেয়। বেলা এগারোটার দিকে সামরিক সরকারের উচ্ছেদ করার আহ্বান জানিয়ে রাবোচি পুৎ পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
২৪ অক্টোবর রাতে লেনিন বিপ্লবের সদর দপ্তর স্মোলনিতে হাজির হন এবং স্বয়ং অভ্যুত্থান পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে জারের উইন্টার প্যালেসে ক্যাডেট ও শক ব্যাটেলিয়নগুলির পাহারায় সামরিক সরকার ঘাঁটি করে অবস্থান করছিল। বলশেভিকদের নির্দেশে রেডগার্ড ও বিপ্লবী সৈনিকেরা এই উইন্টার প্যালেস অবরোধ করে। বলশেভিকদের পরিকল্পনা মতো যুদ্ধ জাহাজ ‘অরোরা’ থেকে উইন্টার প্যালেস লক্ষ্য করে কামানের গোলা বর্ষণের ভিতর দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগের উদ্বোধন হয়। ২৫ অক্টোবর রাতেই শ্রমিক, সৈনিক ও নাবিকরা ঝড়ের মতো আক্রমণ করে উইন্টার প্যালেস দখল করে এবং অস্থায়ী সরকারের সদস্যদের গ্রেফতার করে। ২৫ অক্টোবর তারিখে ‘রুশ দেশের নাগরিকদের প্রতি’ নামে এক ইস্তেহার বলশেভিকরা প্রচার করে। এই ইস্তেহারে বলা হয়, বুর্জোয়া সাময়িক সরকারকে উৎখাত করে সোভিয়েত স্বহস্তে রাষ্ট্র ক্ষমতা তুলে নিয়েছে।

 

এইভাবেই পেট্রোগ্রাডে সশস্ত্র অভ্যুত্থান বিজয়মন্ডিত হয়। আর ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোরব (৭ নভেম্বর) রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে স্মোলনিতে দ্বিতীয় নিখিল রুশ সোভিয়েতে কংগ্রেসের উদ্বোধন হয়। রাজধানীর রাষ্ট্রশক্তি তখন পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের করায়ত্ত। মেনশেভিক, দক্ষিণপন্থী সোস্যালিস্ট রেভল্যুশনারি, বুন্দিস্টরা সোভিয়েতের দ্বিতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিতে অস্বীকার করে। তারা কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে এক বিবৃতি প্রদান করে, যে বিবৃতি কংগ্রেসে পাঠ করা হয়। এই বিবৃতিতে তারা সোভিয়েতের ক্ষমতা দখলকে সামরিক ষড়যন্ত্র হিসাবে বর্ণনা করে। দ্বিতীয় সোভিয়েতের কংগ্রেসের ঘোষণায় বলা হয় যে, “বিপুল সংখ্যাধিক্যে শ্রমিক সৈনিক ও কৃষকদের অনুমোদনের জোরে এবং পেট্রোগ্রাডে শ্রমিক ও সৈন্যবাহিনীর বিজয় অভ্যুত্থানের সমর্থনে কংগ্রেস নিজের হাতে রাষ্ট্র শক্তি গ্রহণ করল।” (সূত্রঃ বলশেভিক পার্টির ইতিহাস)।