07 Jan 2014   11:00:52 PM   Tuesday   BdST

`আধুনিক ঠাকুরগাঁও গড়তে চাই`

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা ৭ জানুয়ারি : ইএসডিও`র ২৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংস্থাটির সর্বস্তরে ব্যাপক আনন্দ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ শহীদ উজ জামান নিউজবুকবিডিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে নানা বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। সাক্ষাত্কারটি নিচে দেওয়া হলোঃ

নিউজবুকবিডি : ইএসডিও`র ২৫ বছরে আপনার অনুভূতি কেমন?

শহীদ উজ জামান: অনুভূতি তো নি:সন্দেহে ভালো। বাইশ বছর আগে সেই ২৮ জন কৃষক নিয়ে আমাদের যাত্রা। সঙ্গে ছিল কিছু উদ্যমী প্রাণ। প্রাণান্ত প্রচেষ্টার স্বপ্ন বিনির্মাণের সেই সৌধ এখন বেশ ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। ইএসডিও`র দীর্ঘ দুই দশকের কর্ম প্রচেষ্টার ফল একটু হলেও আমরা পাচ্ছি। এলাকার দরিদ্র মানুষসহ দেশের ষাট লক্ষাধিক মানুষ এখন ইএসডিও`র সঙ্গে জড়িত। কর্মসংস্থান হয়েছে পাঁচ সহস্রাধিক মানুষের। দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি, স্যানিটেশন, শিক্ষা, মানবাধিকার, সুশাসন বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এখন তো দায়িত্ব আরও বেড়েছে।

নিউজবুকবিডি : রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি?

শ.উ. জামান: জ্বী, সেটাই বলতে যাচ্ছিলাম। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ কর্তৃক ১৯৯৭ সালে ইএসডিওকে শ্রেষ্ঠ বেসরকারি সংস্থা নির্বাচিত করা হয়। এছাড়াও সিটি ব্যাংক ২০০৬ সালে ইএসডিওকে শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্রঋণ দান প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

নিউজবুকবিডি : যতদূর জানি ২৩ জেলায় আপনার সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এটি সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা আছে কী?

শ.উ. জামান: দেখুন, এদেশে ৬৪ জেলার অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা কিন্তু এক নয়। আর আমাদের লক্ষ্যটাও মূলত খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করা। সেক্ষেত্রে দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকাগুলোতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আগামীতে আরও ৮টি নতুন জেলায় ইএসডিও`র কার্যক্রম সমপ্রসারিত হবে। ইতোমধ্যে ইএসডিও আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করতে চলেছে। আমরা শিগিগর আফ্রিকার সুদানে কার্যক্রম শুরু করছি।

নিউজবুকবিডি : দীর্ঘ দু`দশক পেরিয়ে সংস্থাটি নিয়ে কী ভাবছেন? সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা?

শ.উ. জামান: সত্যি বলতে কী কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো নিজের সন্তুষ্টি থাকছেই। এই যেমন ধরুন খাদ্য নিরাপত্তা আর ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমের বিষয়টি। আমার তো মনে হয় এ দুই ক্ষেত্রে আমার সংস্থা অনেকটাই সফল। বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে ইএসডিও একটি প্লাটফরম হিসেবে কাজ করছে। শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই ২ লক্ষ শিশুকে ভিটামিন-মিনারেল সমৃদ্ধ উচ্চ মানসম্পন্ন বিস্কুট খাওয়ানো হচ্ছে।

নিউজবুকবিডি : আর ব্যর্থতা?

শ.উ. জামান: ব্যর্থতা কথাটা সেভাবে অনূদিত করা আসলে কঠিন। তবে আমার মনে হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরও কাজ করা যেত। ক্ষুদ্র ঋণ নীতিগতভাবে পারফেক্ট না। আমাদের মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান দরকার।

নিউজবুকবিডি : শিক্ষা ক্ষেত্রে আপনারা কী করছেন? সম্ভবত ইকো পাঠশালা দিয়েই এক্ষেত্রে আপনাদের যাত্রা শুরু?

শ.উ. জামান: জ্বী, শিক্ষা ক্ষেত্রেও আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি। উপানুষ্ঠানিক-আনুষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রেই আমরা যুক্ত আছি। ২০০১ সালে এ লক্ষ্যে ইকো পাঠশালা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখান থেকে কোমলমতি বাচ্চারা আধুনিক ও সময়োপযোগী শিক্ষা লাভ করছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের বেশকিছু পরিকল্পনা আছে। ইকো পাঠশালা থেকে এখন ইকো কলেজে প্রসারিত হয়েছে।

শ.উ. জামান: ইকো পাঠশালা দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হলেও আমরা আরো সামনে এগোতে চাই। ২ বছর থেকে ইকো কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছে। ২০১৫ সালের মধ্যেই ইকো ইউনিভার্সিটি দাঁড়িয়ে যাবে।

নিউজবুকবিডি :: ইকো ইউনিভার্সিটি- একটু বিশদ বলবেন কী?

শ.উ. জামান: ইকো ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠায় আমরা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছি। লোকায়ন শিশু স্বর্গেই স্থাপিত হবে এ ইউনিভার্সিটি।

নিউজবুকবিডি : এটি কী গতানুগতিক ধারার, নাকি বিশেষায়িত হবে?

শ.উ. জামান: বর্তমান বাণিজ্যিক ঘরানার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এটি হবে না। কারণ সনদ বিক্রি-সর্বস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমরা চাই না। একটি বিশেষ ঘরানার তো বটেই, চোখে পড়ার মতো কিছু বৈশিষ্ট্যও থাকবে। ইকো ইউনিভার্সিটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এখানে এ অঞ্চলের ছেলে-মেয়েরা মানসম্পন্ন শিক্ষা গ্রহণ করবে। এখান থেকে আমেরিকাসহ বিশ্বের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ওরা ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে। রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতন ঘুরে এসেছি আমরা। দেখা যাক ইকো ইউনিভার্সিটির আদলটা কেমন দাঁড় করানো যায়।

নিউজবুকবিডি : স্বাস্থ্য খাতে ইএসডিও কতটা অবদান রাখছে?

শ.উ. জামান: ইএসডিও শুধু একটা এনজিও-ই নয়; এটি একটি সামাজিক সংস্থাও বটে। আমরা সামাজিক একটা দায়বদ্ধতা থেকেও কাজ করছি। অপুষ্টি প্রতিরোধে শিশু ও মায়েদের আমরা সহযোগিতা দিচ্ছি। আমাদের রয়েছে কমিউনিটি হাসপাতাল। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম বেসরকারিভাবে এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসও আমরা দিচ্ছি। মাত্র ৮০ টাকার বিনিময়ে কোনো রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানো হয়। এছাড়াও স্যানিটেশনে আমাদের অগ্রগতি সন্তোষজনক। ১৯৯৯ সালের শতকরা ৯ ভাগ স্যানিটেশন কাভারেজ থেকে বর্তমানে এটি এক`শ ভাগে পৌঁছেছে। আমরা চাই স্বাস্থ্য খাতে অন্যরাও এগিয়ে আসুক।

নিউজবুকবিডি : এক সময় ক্রীড়াঙ্গনে এ জেলার বেশ সুনাম ছিল। এখন জেলার ক্রীড়াঙ্গন ঝিমিয়ে পড়েছে। আপনারা কিছু ভাবছেন কি?

শ.উ. জামান: কিছুদিন আগেই আমরা ইএসডিও ব্যাটমিন্টন গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট করলাম। আমরা এখন তরুণ খেলোয়াড়দের প্রমোট করতে চাই।

নিউজবুকবিডি : ক্রিকেটে তো বেশ সাফল্য পাচ্ছে দেশ?

শ.উ. জামান: তা ঠিক। তবে আপাতত আমাদের মনোযোগ ব্যাটমিন্টন ঘিরেই। তাছাড়া এবার থেকে ইকো পাঠশালা স্কুল ক্রিকেটের আয়োজন রাখছে।

নিউজবুকবিডি : `আমাদের বাজার` নিয়ে কিছু বলবেন?

শ.উ. জামান: আমাদের বাজার আমাদের একটি সামাজিক উদ্যোগ। এখানে স্বল্প মূল্যেই আমরা দোকান বরাদ্দ দিচ্ছি। এখান থেকেও অনেকেই উপকৃত হবেন।

নিউজবুকবিডি : এবার `মিডিয়া` সম্পর্কে কিছু বলুন।

শ.উ. জামান: দেখুন জাতীয় একটা পত্রিকায় আমার গ্রামের ১০টি গরু চুরির খবর কিন্তু সেভাবে কাভারেজ পায় না। অথচ স্থানীয় একটি পত্রিকা এ চাহিদা মেটাতে পারে। স্থানীয় মিডিয়ার সুবিধাটা হলো আমাদের আশপাশের দরিদ্র-মেহনতি মানুষের ছোটখাট দুঃখ, দুর্দশা, আনন্দ সংবাদ সবকিছু তুলে ধরা সম্ভব।

নিউজবুকবিডি : আপনি ঠাকুরগাঁওকে কেমন দেখতে চান।

শ.উ. জামান: আমি আধুনিক ঠাকুরগাঁও জেলা গঠনের স্বপ্ন দেখছি। এই ঠাকুরগাঁও থেকে ইএসডিও উপানুষ্ঠানিক শিড়্গা ড়্গেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রেষ্ঠ বেসরকারি সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এর সকল কৃতিত্ব এ জেলার মানুষের। ইতোমধ্যে ইএসডিও অর্থায়নে জেলা শহওে সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে অবদান রাখছে। আজীবন রেখে যাবে।

নিউজবুকবিডি : আপনাকে ধন্যবাদ

শ.উ. জামান: ইএসডিও এর পক্ষে ঠাকুরগাঁওবাসী ও নিউজবুকবিডিকে ধন্যবাদ।

উল্লেখ্য যে, উত্তর জনপদেও পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ১৯৮৮ সালের ৩ এপ্রিল এই উন্নয়ন সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। কয়েকজন তরুণের সীমিত স্বপ্নের গন্ডি আজ দিগন্ত বিস্তৃেত পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার যুবকের প্রতিদিনের লড়াই ক্ষুধা-দরিদ্র-অজ্ঞতার বিরুদ্ধে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এই সংস্থাটি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। ইএসডিও স্বপ্ন দেখে এমন এক সমতা ভিত্তিক সমাজের, যা আয় ও মানবীয় সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত এবং মানুষ পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশের ২৭টি জেলার ১২৩টি উপজেলার ৪৫ লাখ দরিদ্র নারী-পুরুষ ও শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে ইএসডিও`র প্রায় ৫ হাজার উন্নয়ন কর্মী কাজ করে যাচ্ছে। ২০৫টি অফিসের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ, সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা-সাক্ষরতা, অধিকার- সুশাসন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পুষ্টি, স্যানিটেশন, দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষি ও পশুসম্পদ, এবং নারী-পুরুষ সমতা ভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। যার ধারাবাহিকতায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে সরকার ইএসডিওকে শ্রেষ্ঠ বেসরকারি সংস্থার পদকে ভূষিত করে। ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সিটি ব্যাংক এনএ ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণে শ্রেষ্ঠ সংস্থা হিসেবে সম্মাননা পায়।


নিউজবুকবিডি/২০১৪